ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আত্মসমর্পণের ঘোষণা কেন?

ভারতে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসে তিনি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা বাংলাদেশে ফিরে সরাসরি আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও তিনি মাতৃভূমিতে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।

রয়টার্সকে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। ৭৮ বছর বয়সী আওয়ামী লিগ নেত্রী বলেন, "তারা হয়তো দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেফতার করতে পারে, এমনকী মেরেও ফেলতে পারে। তবুও আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর বর্তমানে চরম দমনপীড়ন ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে।"

Sheikh Hasina announces return to Bangladesh politics

নিজের আবেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা আরও যোগ করেন, "যদি মৃত্যু আমার কপালে লেখা থাকে, তবে তা যেন আমার নিজের দেশের মাটিতেই আসে। যেখানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় বাবা-মা শুয়ে আছেন এবং যেখানে আমাদের পরিবারের রক্ত মিশে আছে।"

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র বিক্ষোভ ও গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তৎকালীন সেনাপ্রধানের পরামর্শে সুরক্ষার স্বার্থে তিনি অত্যন্ত দ্রুত ঢাকা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর অনুপস্থিতিতেই গণ-আন্দোলন দমনের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ক্রমাগত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এর আগে ডঃ মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকেও এই একই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা নিজে জানিয়েছেন, ঢাকা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতের কাছে বারবার অনুরোধ পাঠাচ্ছে।

তবে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে জোর করে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাবের জন্য বসে থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, "আমি নিজেই সেখানে ফিরে যাব ও সমস্ত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হব।" প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার এই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও শামিল হতে চলেছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।

সুরক্ষাবেষ্টনীর মধ্যে থাকা প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও শেখ হাসিনার সাথে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন বলে জানা গেছে। প্রাক্তন এই প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও দেশে একাধিক মামলা ও মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ রয়েছে। নির্বাসন থেকে এভাবে শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে অনেকে রাজনৈতিক প্রতিরোধ হিসাবে দেখছেন।

এদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত সরকার অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণের অনুরোধটি ভারতের নিজস্ব বিচার বিভাগীয় এবং আইনি ব্যবস্থার অধীনে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নয়াদিল্লি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক রাজনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শেখ হাসিনা আদালতের মুখোমুখি হতে চান মূলত তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির আইনি অসারতা প্রমাণ করার লক্ষ্য নিয়ে। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে জনগণের সামনে এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলো কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আন্তর্জাতিক স্তরেও বিচারব্যবস্থার এই রূপ তুলে ধরাই তাঁর এবং তাঁর দলের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন একটি তথাকথিত "হত্যা চেষ্টা" মামলা থেকে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে শেখ হাসিনাসহ ১১২ জনের নাম বাতিলের সুপারিশ করে। তদন্ত কর্মকর্তারা পরে প্রকাশ করেছেন যে, মামলাটির পেছনে কোনো সত্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের ওপর এটি নথিভুক্ত করার রাজনৈতিক চাপ ছিল। এই ঘটনাটি আওয়ামী লীগের তোলা "ভুতুড়ে মামলা"-র অভিযোগকে আরও জোরালো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

কারাবাস বা বন্দি দশা নিয়ে তাঁর মনে কোনো নতুন সংশয় কিংবা ভয় নেই বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী। তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এর আগেও সেনাসমর্থিত ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে দীর্ঘদিন কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন।

ভারতে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা নিজেকে একেবারেই গুটিয়ে নেননি। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে নতুন করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় করতে তিনি নিয়মিত ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন তিনি। দলের পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই তাঁর এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+