দারিদ্র্য জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে কুপ্পম! চন্দ্রবাবু নাইডু ও আদানি ফাউন্ডেশনের দৌলতে ফিরছে হাসি
অন্ধ্রপ্রদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দরিদ্র ও চরম অনগ্রসর পরিবারগুলিকে স্বাবলম্বী করার বড়সড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু সম্প্রতি কুপ্পমে আদানি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথ পার্টনারশিপে 'পাবলিক-প্রাইভেট-পিপল পার্টনারশিপ’ বা পি-ফোর (P4) কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। এই বিশেষ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল 'সোনার পরিবার’ বা 'বঙ্গারু কুটুম্বম’ হিসেবে চিহ্নিত সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক পরিবারগুলির জীবিকার স্থায়ী মানোন্নয়ন করা এবং তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক মুক্তি এনে দেওয়া।
মুখ্যমন্ত্রীর নিজস্ব বিধানসভা কেন্দ্র কুপ্পম মণ্ডলের অন্তর্গত মোট ২৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং তৎসংলগ্ন গ্রামীণ ও শহুরে এলাকাগুলিকে এই সুবিশাল উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এই সামাজিক উদ্যোগে আদানি ফাউন্ডেশন অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের প্রধান পথপ্রদর্শক সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। স্থানীয় স্তরে টেকসই উদ্যোগ তৈরি, আর্থিক সক্ষতা অর্জন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই যৌথ পরিকল্পনার বাস্তবমুখী লক্ষ্য।

কুপ্পমে আয়োজিত এই উদ্বোধনী সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু নিজে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির প্রথম সারির সুবিধাভোগীদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন। অনুষ্ঠানে তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা বহু মানুষের হাতে স্বনির্ভরতার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজের সরঞ্জাম তুলে দেন। বিতরণ করা উপকরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল স্বয়ংক্রিয় সেলাই মেশিন, বহনযোগ্য ওয়েল্ডিং কিট ও আধুনিক এমব্রয়ডারি ডিজাইনিং মেশিন। কর্মসংস্থানের জন্য এই ধরনের সরাসরি সম্পদ স্থানান্তর কীভাবে মানুষের জীবন বদলে দেয়, তা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কুপ্পমের এই কর্মযজ্ঞ আদানি ফাউন্ডেশনের অবিচল সামাজিক দায়বদ্ধতার এক চমৎকার নিদর্শন। এই কার্যক্রম অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের 'দারিদ্র্য শূন্য’ (Zero Poverty) অবস্থা বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। সম্পদের শুধু এককালীন বণ্টন নয়, বরং সেই সম্পদকে বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি অভাবী পরিবার দিনের পর দিন স্থায়ী রোজগারের পথ সচল রাখবে, সেই আধুনিক অর্থনৈতিক বিজ্ঞানই পি-ফোর মডেলের হাত ধরে এখানে শেখানো হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে 'ট্রান্সফর্মিং লাইভস টুগেদার: এ পি-ফোর মডেল ফর হোলিস্টিক প্রোগ্রেস অব বঙ্গারু কুটুম্বম’। সমগ্র রূপায়ণ প্রক্রিয়াটি কুপ্পম অঞ্চলে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে মাঠে নেমে একযোগে কাজ করছে স্বনামধন্য সংস্থা অন্ধ্রপ্রদেশ মহিলা উন্নয়ন সমিতি বা 'আপমাস’ (APMAS)। এই যৌথ সহযোগিতার মূল কথা হল—যাঁরা সাহায্য পাচ্ছেন, তাঁরা যেন নিছক অনুগ্রহপ্রার্থী না হয়ে নিজেই একেকজন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারেন।
পি-ফোর মডেলের অধীনে প্রতিটি পরিবারকে তাদের পূর্ববর্তী কারিগরি দক্ষতা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিস্তারিতভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত বাণিজ্যিক সম্পদ প্রদান করা হচ্ছে। যেমন গ্রামীণ এলাকায় কারও যদি ছোট পরিসরে মুদি দোকান চালুর করার অভিজ্ঞতা থেকে থাকে, তবে তাঁকে সেই ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে। একইভাবে পশুপালন, ক্ষুদ্র টেইলারিং ইউনিট চালুর কিংবা হস্তশিল্প নির্ভর অতিক্ষুদ্র ব্যবসা বা মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ গঠনে সার্বিক আর্থিক ও পরিকাঠামোগত যোগান দিচ্ছে এই ফাউন্ডেশন।
উদ্যোগের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই প্রকল্পের কাঠামোয় 'বঙ্গারু মিত্র’ নামের একটি বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী মেন্টরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এই মেন্টর বা সহায়ক কর্মীরা প্রতিটি প্রান্তিক পরিবারের অর্থনৈতিক যাত্রার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। বঙ্গারু মিত্ররা মূলত সুবিধাভোগীদের নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করবেন এবং একইসঙ্গে ক্ষুদ্র আর্থিক লেনদেনের নিয়মাবলী ও ব্যাংকিং পরিষেবার সাথে তাঁদের নিবিড় সংযোগ নিশ্চিত করাবেন।
সম্পদ বিতরণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোই এই উন্নয়নমূলক পরিকাঠামোর প্রধান স্তম্ভ। আদানি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ডঃ প্রীতি আদানি এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা নিয়ে নিজের গভীর সন্তোষ ও শুভেচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এক বিশেষ বার্তায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যে কোনও দেশের স্থায়ী অগ্রগতি আসলে শুরু হয় একেবারে পারিবারিক স্তর থেকে। দরিদ্র পরিবারগুলি যখন সঠিক সুযোগ, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও মেন্টরশিপের সহায়তা পায়, তখন তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর সমাজ গড়ে তোলে।
বর্তমানে আদানি ফাউন্ডেশন অন্ধ্রপ্রদেশের প্রায় ১৫০টি প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পুষ্টির মানোন্নয়ন, স্থায়ী জীবিকার সন্ধান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বভারতীয় স্তরে ২২টি রাজ্যের ৭,২০০টিরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং শহুরে অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে গিয়েছে তাদের সমাজকল্যাণমূলক বহুবিধ উদ্যোগ। কুপ্পমের এই রূপান্তর মূলক নতুন পি-ফোর প্রকল্পটি সেই ধারাবাহিক সেবামূলক যাত্রারই এক অন্যতম সার্থক প্রসার।
কুপ্পমের এই পি-ফোর মডেল ভারতের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের অন্যতম সেরা চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকার, বেসরকারি কর্পোরেট উদ্যোগ ও সাধারণ অংশীদারদের এই সার্থক ও সুসংগত ত্রিবেণী সঙ্গম অন্য সমস্ত রাজ্যগুলির কাছেও দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে সমাদৃত হবে। মানুষের নিজস্ব কর্মদক্ষতার ওপর ভরসা রেখে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি কোণে স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ ছড়িয়ে দেবে।












Click it and Unblock the Notifications