বিজেপিতে যোগ দিয়েই রাজ্যসভার টিকিট পেলেন তিন প্রাক্তন তৃণমূল নেতা-নেত্রী
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব এবং নাটকীয় মোড় পরিলক্ষিত হল এদিন। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে কিছুদিন বিশ্রামে থাকার পরে এদিন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বড় পুরস্কার পেলেন তিন হেভিওয়েট প্রাক্তন তৃণমূল নেতা-নেত্রী। এদিন রাতে বিজেপির সর্বভারতীয় কমিটির তরফে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন রাজ্যসভা উপনির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে সদ্য দলত্যাগী সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের নাম সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতার সল্টলেকে অবস্থিত বিজেপির রাজ্য সদর দফতরে গিয়ে এই তিন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে গেরুয়া শিবিরের পতাকা হাতে তুলে নেন। তাঁদের এই আকস্মিক দলবদলের পর থেকেই বাংলার রাজনৈতিক মহলে তুমুল গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল যে, এঁদের সম্ভবত পুনরায় সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠাতে পারে বিজেপি। সেই জল্পনাকে পূর্ণতা দিয়ে রাত ন’টা নাগাদ দিল্লির সদর দফতর থেকে এই তিনজনের নাম চূড়ান্ত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিজেপি নেতৃত্ব।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের আশাতীত ভরাডুবির পর ঘাসফুল শিবিরে যে তীব্র ভাঙন ধরেছিল, এই ঘটনাকে তারই সরাসরি ফল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। দলের পরাজয়ের পরপরই রাজ্যসভার তিন সাংসদ পদত্যাগ করেন, যা রাজ্যের রাজনীতিতে এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। এখন সেই শূন্য আসনগুলি থেকে আবার তাঁরাই রাজ্যসভায় ফিরছেন, তবে এবারের পরিচয় হবে বিজেপির জনপ্রতিনিধি হিসেবে।
আসনগুলির মেয়াদের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে এই তিন নেতার কাজের মেয়াদ এখনও অনেক দিন বাকি ছিল। প্রাক্তন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় এবং উত্তরবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলের যুব নেতা প্রকাশ চিক বরাইকের কার্যকাল ছিল ২০২৯ সাল পর্যন্ত। অন্যদিকে, অসমের শিলচরের প্রভাবশালী নেত্রী সুস্মিতা দেবের দিল্লির দরবারে থাকার মেয়াদ ছিল ২০৩০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে তাঁরা মাঝপথেই ইস্তফা দেন।
এই হেভিওয়েট নেতাদের পদত্যাগের ফলে রাজ্যসভার তিনটি খালি আসনে আগামী ২৪ জুলাই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন সংখ্যার হিসেব অনুযায়ী, সংখ্যার নিরিখে এই তিন আসনে বিজেপি প্রার্থীদের জয়লাভ কার্যত সময়ের অপেক্ষা। অন্যদিকে, বিধানসভার বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সংখ্যার সংকটের কারণে তৃণমূলের পক্ষে কোনও প্রার্থী দাঁড় করানোর সুযোগ নেই। ফলস্বরূপ, ভোটগ্রহণের আগেই এই আসনগুলির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে।
এদিন সল্টলেকে বিজেপির কার্যালয়ে যখন শুভেন্দু অধিকারী ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এই তিনজনের হাতে পদ্ম পতাকা তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর কাছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন যে, এই তিনজনকেই কি রাজ্যসভায় পাঠাতে চলেছে দল? জবাবে শমীকবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মুচকি হেসে বলেন, "চর্চা চলতে থাকুক, চর্চাতেই অনেক সত্যি লুকিয়ে থাকে।" তাঁর সেই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই আসল সত্যটি সামনে চলে এল।
তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসা এই তিন নেতার রাজনৈতিক গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুখেন্দুশেখর রায় দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক মুখ ও সুবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংসদীয় রীতি ও নীতি সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানকে এবার নয়াদিল্লিতে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে বিজেপি নেতৃত্ব। রাজ্যসভায় বিতর্কের সময় তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেতার উপস্থিতি বিজেপির শক্তি এবং গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বাড়িয়ে তুলবে।
অন্যদিকে, অসমের রাজনীতিতে সুস্মিতা দেবের পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী। কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ ও মহিলা কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি থাকার সুবাদে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে তাঁর সংগঠন সামলানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অসমে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় দলীয় ভিত্তি মজবুত করতে সুস্মিতাকে বড় সুযোগ দিতে চলেছে গেরুয়া দল। একই সঙ্গে জাতীয় স্তরে বিজেপির মহিলা মুখ হিসেবেও তাঁকে ব্যবহার করা হতে পারে।
উত্তরবঙ্গের আলুয়াবাড়ি এবং আলিপুরদুয়ার অঞ্চলের আদিবাসী তথা চা-বাগান শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকাশ চিক বরাইকের গুরুত্বও নেহাত কম নয়। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভালো ফলের পিছনে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণ একটি বড় কারণ ছিল। প্রকাশ চিক বরাইকের মতো ভূমিপুত্রকে নিজেদের পাশে পেয়ে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও চা-বলয়ের ভোটারদের কাছে বিজেপি খুব সহজেই বার্তা দিতে সক্ষম হবে যে, তারা প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়বদ্ধ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল সাময়িক ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং বিজেপির একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশল। একই দিনে যোগদান এবং একই দিনে রাজ্যসভার টিকিট দেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। দলবদলের এই ঝোড়ো ইনিংস পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও, রাজ্য বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের মনোবলকে তা অনেকটাই চাঙা করেছে। বিধানসভা নির্বাচনের ধাক্কা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার এটি একটি মোক্ষম দাওয়াই।
যেকোনও নির্বাচনের পরই ভাঙন এবং নতুন মেরুকরণ ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গেও সেই দলবদলের যে খেলা শুরু হয়েছিল, এই তিন নেতার বিজেপিতে যোগদান এবং সঙ্গে সঙ্গে মনোনয়ন প্রাপ্তি তার শেষ কথা নয়। আগামী ২৪ জুলাইয়ের আনুষ্ঠানিক ভোটাভুটি মিটে গেলেই বোঝা যাবে যে, পরিবর্তিত দলের প্রতীকে এই সাংসদেরা সংসদে বাংলার দাবি কতটা জোরালোভাবে তুলে ধরতে সফল হন।












Click it and Unblock the Notifications