মেলবোর্নে দাঁড়িয়ে অপারেশন সিঁদুর প্রসঙ্গ টানলেন মোদী, বিশ্বজুড়ে ভারতের জয়জয়কারে গর্বিত প্রধানমন্ত্রী, আরও এগোনোর অঙ্গীকার
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনাবাসী ভারতীয়দের এক সভায় দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক শক্তির উত্থানের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মার্ভেল স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল সভায় তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভারত এখন আর সন্ত্রাসবাদ মুখ বুজে সহ্য করে না। পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার জবাবে ভারতের চালানো 'অপারেশন সিঁদুর' বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কড়া জবাবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের পর জঙ্গি শিবিরের বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি সারা বিশ্বে শোনা গিয়েছিল। এই অনমনীয় অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করেছে যে ভারত নিজের নিরাপত্তা রক্ষায় কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেন, জঙ্গি ঘাঁটিতে যখন এমন চূড়ান্ত সামরিক আঘাত হানা হয়েছিল, তখন কি তাঁদের বুক গর্বে ভরে ওঠেনি? তাঁর এই প্রশ্নে করতালিতে ফেটে পড়ে গোটা স্টেডিয়াম।

তিনি আরও জানান, ভারতের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা আজ আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন পরিচিতি ও সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। অপারেশন সিঁদুরের সাফল্য দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। আগের তুলনায় বর্তমান ভারত যে কোনও ধরনের বহিঃশত্রুর হানা রুখতে বা শত্রুর সীমানায় ঢুকে নিখুঁত আঘাত হানতে কতটা প্রস্তুত, তা প্রধানমন্ত্রীর এদিনের বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে।
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির খতিয়ানও মেলবোর্নের মঞ্চে সবিস্তারে তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, বিগত ১২ বছরে 'মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত মানের মোবাইল ফোন, আধুনিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, বিলাসবহুল গাড়ি এবং জীবনদায়ী ওষুধ এখন বিশ্বের সর্বত্র রফতানি হচ্ছে, যা ভারতীয় অর্থনীতির শক্ত ভিত্তির পরিচায়ক।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও জেদই দেশের এই মহাবিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি স্বপ্ন বা লক্ষ্য পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারত বসে থাকে না, বরং আরও বড় একটি সঙ্কল্প গ্রহণ করে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের দ্রুততম গতিতে এগিয়ে চলা প্রধান অর্থনীতি এবং খুব দ্রুত ভারতকে বিশ্বের শীর্ষ তিনটি অর্থনীতির অন্যতম স্থানে নিয়ে যাওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিকাঠামো গঠনেও ভারত অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তেও এখন ডিজিটাল লেনদেন পৌঁছে গেছে, যা বিশ্বের দরবারে ভারতকে এক অনন্য স্থানে বসিয়েছে। দেশের মানুষের এই প্রযুক্তিগত অভিযোজন ক্ষমতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশকে আরও ت্বরান্বিত করছে এবং বিদেশের বিনিয়োগকারীদের ভারতকে বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারতের অভাবনীয় সাফল্যের কথা উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ভারত আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফাইভ-জি (5G) বাজারে পরিণত হয়েছে। তবে ভারতের উদ্ভাবনী শক্তি কেবল ফাইভ-জির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত মানের সিক্স-জি (6G) পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় চালুর উদ্দেশ্যে দেশ পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছে, যা আগামী দিনে বিশ্বকে পথ দেখাবে।
মেলবোর্নে তাঁকে দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনায় অত্যন্ত আপ্লুত দেখায় প্রধানমন্ত্রীকে। সেখানকার প্রবাসী ভারতীয় এবং অস্ট্রেলীয় বন্ধুদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি রসিকতা করে মন্তব্য করেন, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মেলবোর্ন যেন সবার লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছে। মঞ্চে মানুষের বিপুল জমায়েত, তাঁদের উৎসাহ এবং স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দুই দেশের মধ্যকার গভীর ভালোবাসার সম্পর্ককে আরও একবার সর্বসমক্ষে প্রমাণ করে দিল।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজকে ভারতের এক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে মনে করিয়ে দেন, এর আগে সিডনির একটি বৃহৎ অনুষ্ঠানেও তাঁরা দুজনে একসঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে ভারত-অস্ট্রেলিয়া বন্ধুত্বের জয়গান গেয়েছিলেন। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
প্রবাসী ভারতীয়দের সামাজিক অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে মোদী বলেন, অনাবাসী সম্প্রদায় একদিকে যেমন নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সফল, ঠিক তেমনই নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বিদেশের মাটিতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁরা ভারতীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে আরও সমৃদ্ধ করছেন। মেলবোর্নের ভারতীয়দের নিজেদের দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিষয়টিকে স্যালুট জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
তিনি বলেন, বিদেশের মাটিতে নিয়মিত সত্যনারায়ণ ব্রতকথা মহিমা গাওয়া, গুরুদ্বারে গিয়ে শ্রদ্ধার সাথে আরদাস পাঠ করা, ভরতনাট্যম ও ভাঙড়া নৃত্যের মনোজ্ঞ পরিবেশনা থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন—সবই আসলে ভারতের আত্মাকে প্রবাসে সজীব রাখার চেষ্টা। এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতীয়দের সংস্কৃতির এক একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন।
মেলবোর্নের এই ঐতিহ্যবাহী সমাবেশ বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক গুরুত্বের এক অনবদ্য প্রতিফলন ঘটাল। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ও অনাবাসীদের উদ্দেশে দেওয়া কালজয়ী বার্তা একদিকে যেমন মেলবোর্নে থাকা ভারতীয়দের মনে নতুন করে দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং আর্থিক সমৃদ্ধির দিকে ভারতের ক্রমশ সুপারপাওয়ার হয়ে ওঠার রূপরেখাকে গোটা বিশ্বের দরবারে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছে।












Click it and Unblock the Notifications