আরএসআই-ইন্ডিয়া ২০২৬: বিশুদ্ধ বিজ্ঞান গবেষণার এক অনন্য উদ্যোগ, সাহায্যে এগিয়ে আদানি গ্রুপও
ভারতে বিজ্ঞানচর্চা এবং গবেষণার মানোন্নয়নে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)। দেশের আগামী দিনের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানমনস্ক নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে সফলভাবে সম্পন্ন হল 'রিসার্চ সায়েন্স ইনিশিয়েটিভ' বা আরএসআই-ইন্ডিয়া ২০২৬। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের গবেষণার হাতেখড়ি দিতে এবং বিশ্বের প্রথম সারির গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই ছয় সপ্তাহের নিবিড় আবাসিক কর্মশালা এবং গবেষণা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কঠোর পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে বাছাই করা মোট ৩২ জন প্রতিভাবান শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।
বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বা এমআইটি-র আদলে ভারতের এই বিশেষ কর্মসূচিটি ডিজাইন করা হয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক স্তরে এমআইটি-র এই গবেষণা শিবির অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। তার আদলেই ভারতে নিখরচায় উচ্চমানের গবেষণার ধারাকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সেন্টার ফর এক্সেলেন্স ইন এডুকেশন' (CEE) এবং আইআইএসসি বেঙ্গালুরুর যৌথ পরিচালনায় এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়েছে। কর্মসূচির সম্পূর্ণ আর্থিক ব্যয়ভার বহন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট সংস্থা আদানি গ্রুপ। ফলে পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা না করে একদম প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী পড়ুয়ারাও কোনও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বিশ্বমানের গবেষণার ছোঁয়া পেলেন।

মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন জোয়ার আনার প্রয়াস
বর্তমান ভারতে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের কেরিয়ারের মূল লক্ষ্য থাকে চিকিৎসা কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিকে। এই চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে তরুণ প্রজন্মকে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের গবেষণায় আকৃষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা। আরএসআই-ইন্ডিয়ার ফ্যাকাল্টি কনভেনার অধ্যাপক দীপক সাইনি দেশের গবেষণার প্রসারে এই ধরনের উদ্যোগকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন। তাঁর মতে, স্কুলজীবনেই শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যতের দিশা ঠিক করে এবং বেশিরভাগ সময়ই দেশের উজ্জ্বল মনগুলি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার গণ্ডিতে আটকে পড়ে।
অধ্যাপক সাইনি এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন যে, তরুণ শিক্ষার্থীদের মাথায় যখন নতুন আইডিয়া থাকে, তখনই তাদের গবেষণার জগতের স্বাদ পাইয়ে দেওয়া দরকার। বর্তমান ভারতে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান এবং মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে মেধাবী বিজ্ঞানীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যারা দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন করতে পারবেন। আইআইএসসি বেঙ্গালুরুর গবেষণাগারগুলিতে এই তরুণ মস্তিষ্কগুলিকে সরাসরি পরীক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ দিয়ে তাদের সেই চাহিদাকেই ত্বরান্বিত করা হয়েছে। আদানি গ্রুপের সঙ্গে এই যৌথ উদ্যোগটি যে সফলভাবে শেষ হয়েছে, তা বিজ্ঞান শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে বলে আশা গবেষকদের।
এই ছয় সপ্তাহের কর্মশালায় শিক্ষার্থীরা শুধু ল্যাবরেটরির চার দেওয়ালে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা আইআইএসসি-র প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে মেন্টরশিপ প্রোগ্রামে নিজেদের আইডিয়াকে পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন। দেশের প্রথম সারির গবেষকদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিক্ষার্থীরা যেমন শিখেছেন, ঠিক তেমনই বিজ্ঞানী সমাজও এই তরুণদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা প্রত্যক্ষ করে দারুণভাবে আশাবাদী হয়েছেন। সায়েন্স অলিম্পিয়াডের মতো কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাছাই হওয়া এই শিক্ষার্থীরা যে ভবিষ্যতে দেশে বড় কোনও আবিষ্কারের কাণ্ডারি হতে পারেন, সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে এই ছয় সপ্তাহের কঠোর অনুশীলনে।
বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিজ্ঞতা
এই গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা তাদের দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে সমাজের প্রতিটি পিছিয়ে পড়া ও সাধারণ পরিবারের মেধাবী পড়ুয়ারা যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্বমানের জ্ঞান অন্বেষণ থেকে দূরে না সরে যায়, তা নিশ্চিত করেছে আদানি গ্রুপের এই শতভাগ স্পনসরশিপ। এই সামগ্রিক উদ্যোগের প্রশংসা করতে গিয়ে শিব মাণ্ডলিক নামের এক অংশগ্রহণকারী ছাত্র দারুণভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, দেশের সমস্ত অংশের মেধাবী পড়ুয়াদের জন্য এটা এমন এক জীবন পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতা যা ভাবাই যায় না। কোনও অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই গভীর বিশ্লেষণের সুযোগ সত্যিই অভূতপূর্ব।
অন্যতম প্রতিভাবান শিক্ষার্থী গবেষক প্রদ্যুন এই গ্রীষ্মকালীন শিবিরের কঠোর পরিবেশকে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ছয় সপ্তাহ ছিল পরিশ্রম আর বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার এক অনবদ্য মিশ্রণ। ল্যাবরেটরিতে প্রজেক্ট তৈরির পাশাপাশি বিজ্ঞান গ্যালারি পরিদর্শন ও বিবিধ সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম পুরো অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। প্রদ্যুন দৃঢ়ভাবে মনে করেন যে, বিশুদ্ধ বিজ্ঞানে তরুণদের মনোনিবেশ বাড়ানোর লক্ষ্যে আরএসআই-ইন্ডিয়ার মতো এহেন কর্মসূচির ধারাবাহিকতা আগামী অন্তত দশ বছর বজায় রাখা উচিত, যাতে দেশের মাটিতে নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়মিত হতে পারে।
একই সাথে সমমনা বন্ধুদের সাথে কাটানো রোমাঞ্চকর ক্ষণগুলোর কথা তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী তানিষ্ক। বিজ্ঞান শিক্ষার গহীনে প্রবেশ করার আনন্দের পাশাপাশি একই মানসিকতার সহপাঠীদের সাথে আলাপচারিতা ছিল তাঁর জন্য সেরা অংশ। সমমনা বিজ্ঞানপ্রেমীদের এই দল একে অপরের পাশে থেকে আনন্দ যেমন ভাগ করে নিয়েছে, তেমনই তাদের চিন্তাশক্তিকেও এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছে যা শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় অসম্ভব ছিল। এই বোঝাপড়া আগামী দিনেও তাদের এই বৈজ্ঞানিক গবেষণার মেলবন্ধন টিকিয়ে রাখতে পথ প্রদর্শন করবে।
আরএসআই-ইন্ডিয়া ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে ওই ৩২ জন কৃতি শিক্ষার্থীর আধুনিক গবেষণা প্রকল্পগুলির সফল উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তরুণ ভারতের এক দুর্দান্ত চালচিত্র ফুটে উঠল। উপস্থিত মেন্টর, বিজ্ঞানী ও অতিথিরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং কৃতীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন হয়। এই ধরনের পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের সুফল অদূর ভবিষ্যতেই দেখা যাবে। আইআইএসসি বেঙ্গালুরুর গবেষণাগারে কাটানো এই সময় আগামী দিনে এই তরুণ বিজ্ঞানীদের বৈজ্ঞানিক আত্মবিশ্বাস জোগাতে এবং ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা নেবে।












Click it and Unblock the Notifications