আদালতের ধমক খেয়ে 'ডিজে ইস্যু'-তে মামলা প্রত্যাহার অভিষেকের, দিতেই হবে কণ্ঠস্বরের নমুনা
কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি টানাপড়েনের পর অবশেষে বিতর্কিত 'ডিজে মামলা’য় তাঁর কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতে রাজি হয়েছেন। কলকাতা হাইকোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়ে তাঁর আইনজীবীরা কণ্ঠস্বরের নমুনা দেওয়ার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা মামলাটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। আগামী ১৫ জুলাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধাননগর আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজের কণ্ঠস্বরের নমুনা জমা দেবেন।
শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে এই মামলাটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। শুনানি চলাকালীন বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বিভিন্ন এজলাসে বারংবার পৃথক আবেদন করে আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। এই ধরনের গড়িমসি কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা না করলে সাংসদকে দেওয়া আইনি রক্ষাকবচ বাতিল করা হতে পারে।

আইনি মহলের মতে, হাইকোর্টের এই কঠোর অবস্থানের পর শাসক দলের এই শীর্ষ নেতার সামনে সুরক্ষাকবচ বাঁচানোর আর কোনও পথ খোলা ছিল না। এর আগে হাইকোর্টের একটি পর্যালোচনায় ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ ধারা অনুযায়ী অভিষেককে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছিল, যার প্রধান শর্তই ছিল তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা। আদালতের হুঁশিয়ারিতে সেই রক্ষাকবচ চলে যাওয়ার উপক্রম হতেই পিছু হঠল তাঁর আইনি দল।
ঠিক কী ঘটেছিল এই 'ডিজে মামলা’ নিয়ে? জানা গিয়েছে, এক জনসভায় তৃণমূল যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ও বিতর্কিত আকার ধারণ করে। পরে সিআইডি এই ঘটনার তদন্তভার পাওয়ার পর তাঁর কণ্ঠস্বর পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিষেক অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে ভাইরাল হওয়া বক্তব্যটি এবং সেখানে থাকা গলার আওয়াজটি তাঁর নিজেরই।
কণ্ঠস্বর নিজের বলে স্বীকার করে নেওয়ার পরেও কেন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, তা নিয়ে হাইকোর্টে জোর সওয়াল করেন অভিষেকের আইনজীবীরা। আদালত অবশ্য স্পষ্ট জানান, তদন্তের খাতিরে এবং প্রমাণ সংগ্রহের আইনি সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য নিরপেক্ষ ফরেনসিক ল্যাবে গলার আওয়াজের নমুনা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল মুখের কথায় মামলার তথ্যপ্রমাণ সাজানো অবৈজ্ঞানিক ও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, তাঁর মক্কেলকে তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতে জোর করা হচ্ছিল, যা তাঁর আইনি সুরক্ষাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। কিন্তু আদালত এই যুক্তি গ্রাহ্যই করেনি। সিআইডি ইতিপূর্বে তাঁকে তলব করেছিল এবং তিনি নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা দিয়েছিলেন, কিন্তু বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতেই তিনি মামলার আড়ালে ভিন্ন রূপ দিতে সচেষ্ট হন।
শুক্রবারের শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাঁর বিরক্তি আড়াল করেননি। তিনি বলেন, "কখন কণ্ঠস্বরের নমুনা দেবেন? সব কিছুর একটা সর্বোচ্চ সীমা থাকা উচিত। তদন্তে সহযোগিতা না করলে আমি পূর্ববর্তী সমস্ত রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করব।" বিচারপতি আরও বলেন যে, আদালতের নোটিসে যথাযথ সাড়া দিয়ে তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক কর্তব্য। যদি কেবল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টা চালানো হয়, তবে মামলাটি শুধু খারিজই করা হবে না, সাথে বড় অঙ্কের জরিমানাও করা হবে। এরপরই অভিষেকের আইনজীবী সিদ্ধান্ত বদলান।
কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতে রাজি হওয়ার পর অভিষেকের আইনজীবীর পক্ষ থেকে আদালতে আরও এক আবেদন জানানো হয়। তিনি বিচারপতিকে আর্জি জানান, তাঁর মক্কেল তৃণমূলের অত্যন্ত উচ্চ স্তরের নেতা হওয়া সত্ত্বেও জনরোষের আশঙ্কা রয়েছে। ১৫ জুলাই যখন তিনি বিধাননগর আদালতে যাবেন, তখন কিছু অতি-উৎসাহী ব্যক্তি বা বিরোধী পক্ষের সমর্থকেরা যেন অভিষেককে উদ্দেশ্য করে ডিম না ছোঁড়েন।
আইনজীবীর এই আর্জির জবাবে বিচারপতি পুলিশকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সময় রাজনৈতিক ব্যক্তির নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব। বিধাননগর আদালত চত্বরে ১৫ জুলাই যেন কোনও ধরনের ডিম হামলার ঘটনা না ঘটে, পুলিশ প্রশাসনকে তা সুনিশ্চিত করতে হবে।












Click it and Unblock the Notifications