রান্নার গ্যাসের সঙ্কট কাটতেই আরও বড় বিপাকে দেশের সরকারি তেল সংস্থাগুলি, কারণ জানলে অবাক হবেন!

পশ্চিম এশিয়া সঙ্কটের জেরে রান্নার গ্যাসের জোগানে টান পড়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। তবে আশঙ্কার মেঘ কেটে যেতেই এখন উল্টো সঙ্কটে পড়েছে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC), ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPCL) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (HPCL) মতো ফুয়েল রিটেলাররা। বর্তমানে দেশের বাজারে রান্নার গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়ায় উদ্বৃত্ত এলপিজি (LPG)-র বিশাল মজুত নিয়ে তারা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সূত্রের খবর, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ যখন চরমে ছিল, তখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ভারত দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার টন পর্যন্ত এলপিজি আমদানির অগ্রিম বুকিং দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রশমিত হওয়ায় ভারতের দৈনিক আমদানির প্রয়োজনীয়তা নেমে এসেছে ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টনে। ফলে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ এই অতিরিক্ত গ্যাসের ভাণ্ডার এখন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির কাছে অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

Indian oil storage tanks filled with surplus LPG gas

আন্তর্জাতিক জলসীমায় অস্থিরতার জেরে রান্নার গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখতে শুধু আমদানি বাড়ানোই হয়নি, বরং দেশের অভ্যন্তরেও এলপিজির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলি। সংকটের চরম পর্যায়ে ভারতের ঘরোয়া গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাড়িয়ে দৈনিক ৫৪ হাজার টনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় এই উৎপাদন কমিয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার টনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

সাধারণত হরমুজ প্রণালী ভারতের জ্বালানি আমদানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি নৌপথ। এই রুটটি বন্ধ হলে দেশের জ্বালানি সুরক্ষায় বড় আঘাত হানতে পারত। এই আশঙ্কায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থাগুলি আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আকস্মিকভাবে হ্রাস পাওয়া এবং বিশ্ববাজারের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা ভারতের তেল ক্ষেত্রগুলির মজুত ব্যবস্থাপনায় এক সাময়িক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত এলপিজি আমদানি করার জন্য যে চুক্তিগুলি করা হয়েছিল, সেগুলি দ্রুত বাতিল বা স্থগিত করা তেল সংস্থাগুলির জন্য সহজ ছিল না। চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জোগান যখন ভারতে এসে পৌঁছাতে শুরু করে, ততদিনে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেকখানি সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির গুদাম ও স্টোরেজ টার্মিনালগুলিতে গ্যাসের মজুত ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের এই বিপুল উদ্বৃত্ত মজুতের পেছনে শুধু অতিরিক্ত আমাদানি বা দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তই কাজ করেনি, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার আকস্মিক পতন এক প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বড় বড় বাণিজ্যিক গ্রাহক, যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সিরামিক প্রস্তুতকারক শিল্প কারখানাগুলি রান্নার গ্যাসের সংকটের সময় বিকল্প জ্বালানির সন্ধান করেছিল এবং দ্রুত সেগুলির ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

শিল্পক্ষেত্রে জ্বালানির অভাব মেটাতে এই বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি দ্রুত পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (PNG) বা পিএনজি-র দিকে ঝুঁকে পড়ে। পিএনজি ব্যবহারের সুবিধা এবং অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে শিল্প ক্ষেত্রে রান্নার গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সংকট কেটে যাওয়ার পরেও এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের একটি বড় অংশ আর এলপিজি ব্যবহারের পুরনো ধারায় ফিরে আসেনি।

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে এলপিজির বাজারে চাহিদার এই পতন কতটা গভীর। এবছরের জুন মাসে দেশে এলপিজি ব্যবহারের গড় দৈনিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৭৩ হাজার টন। অথচ এর আগের অর্থবছর, যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে শেষ হয়েছিল, তাতে দৈনিক এলপিজি ব্যবহারের গড় পরিমাণ ছিল প্রায় ৯১ হাজার টন। এই বিশাল ঘাটতিই প্রমাণ করে যে বাণিজ্যিক পরিবর্তনের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী।

এলপিজি বাজার সূচক সংকটকালীন স্থিতি (দৈনিক) বর্তমান স্থিতি (দৈনিক)
আমদানি বুকিং ও প্রয়োজন ৪০ হাজার টন পর্যন্ত ৩০ হাজার - ৩২ হাজার টন
অভ্যন্তরীণ শোধনাগারের উৎপাদন ৫৪ হাজার টন ৪০ হাজার টন
দেশের সামগ্রিক গ্যাসের ব্যবহার ৯১ হাজার টন (মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত) ৭৩ হাজার টন (জুন ২০২৬)

রান্নার গ্যাসের চাহিদা এভাবে হ্রাস পাওয়ায় এবং বিপুল উদ্বৃত্ত মজুত জমে থাকায় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থাগুলির কার্যক্ষমতা ও আর্থিক অবস্থার ওপর এর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। মজুত করা উদ্বৃত্ত গ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে স্টোরেজে রাখার ফলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ পুনর্বিন্যাস করা এবং নতুন করে বাণিজ্যিক চাহিদা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের জ্বালানি পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের নতুন নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মজুদ বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত আমদানির ওপরে নির্ভর করার কৌশল যে সবসময় শতভাগ কার্যকর হয় না, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির বর্তমান পরিস্থিতি তারই বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মোকাবিলা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির এই আগাম তৎপরতা আবশ্যক হলেও, বর্তমানের উদ্বৃত্ত মজুদ বাজার ও অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা। বাজারে চাহিদার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা সাজানো প্রয়োজন। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে নমনীয় রাখাই এখন একমাত্র পথ।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+