আদানি মামলায় সংবাদমাধ্যমের তৈরি কল্পনা খারিজ মার্কিন আদালতে, 'কোনও মূল্য নেই', পর্যবেক্ষণ আদালতের

শিল্পপতি গৌতম আদানি ও তাঁর সহযোগী বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সিকিউরিটিজ বা শেয়ার বাজার সংক্রান্ত সমস্ত ফৌজদারি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DoJ)। ফেডারেল আদালতে জমা দেওয়া নথিতে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণভাবে আইনি যৌক্তিকতা, ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা এবং উপযুক্ত প্রমাণের অভাবের ওপর ভিত্তি করে।

এই ঘটনাটির পর আন্তর্জাতিক স্তরে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন জল্পনা তৈরি হয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আদানি গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্ভাবনা কিংবা নতুন কোনও বৃহৎ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির কারণেই হয়তো আমেরিকার প্রশাসন এই নমনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে মার্কিন বিচার বিভাগের শীর্ষ আধিকারিক আর ট্রেন্ট ম্যাককোটার আদালতে হলফনামা পেশ করে এই ধরনের সব রকমের দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছেন এবং এগুলিকে সামগ্রিকভাবে 'মিথ্যা' বলে অবহিত করেছেন।

Gautam Adani legal case updates in US court

এই আইনি পদক্ষেপটির গুরুত্ব বিবেচনা করে মার্কিন আধিকারিকের দাখিল করা নথিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, আদানির তরফ থেকে মার্কিন ভূখণ্ডে নতুন বিনিয়োগের কোনও প্রকার আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার বহুকাল আগেই সরকারের আইনি বিশেষজ্ঞরা মামলা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। মূলত দুই পক্ষের পেশ করা যুক্তি ও নথিপত্রের গভীর পুনঃবিশ্লেষণ করার পরই বিচার বিভাগ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল।

আদালতে জমা দেওয়া মার্কিন বিচার বিভাগের চার্জশিট পর্যালোচনা বা নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, মূল মামলার গোড়াতেই একাধিক গুরুতর আইনি সংগতিহীনতা বা পদ্ধতিগত দুর্বলতা বর্তমান ছিল। আমেরিকার বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে এই আইনি প্রতিবন্ধকতাগুলিকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবার প্রথম বড় ধাক্কাটি ছিল মামলার এক্তিয়ারভুক্ত এলাকার সাধারণ সীমাবদ্ধতা বা আন্তর্জাতিক জুরিসডিকশন সংক্রান্ত বিতর্কিত দিকগুলি।

এছাড়া, মামলাটির সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের কোনওরকম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আর্থিক ক্ষতির স্পষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অনুপস্থিতি। আমেরিকার বাজারে আদানির কর্মকাণ্ডের ফলে আদতে বিনিয়োগকারীদের কোনও আর্থিক অঙ্কের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে কিনা, তা আদালতে অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল সরকার পক্ষ।

আইনি প্রক্রিয়ার এই ত্রুটিগুলির পাশাপাশি ভারতের ভূখণ্ডে ভারতীয় নিজস্ব নিয়ন্ত্রক এবং আইন রূপায়ণকারী সংস্থাগুলির সমান্তরাল বিশ্লেষণ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ তদন্তের সামগ্রিক কাঠামো এবং তথ্যগুলিও এই মামলায় তাদের চার্জ গঠনের মৌলিক বিষয়টিকে আইনি দিক থেকে দুর্বল করতে ভূমিকা পালন করেছে।

জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা আর ট্রেন্ট ম্যাককোটার নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে আদালতে জানিয়েছেন যে, যদি আদানির তরফ থেকে মার্কিন কোনও সেক্টরে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের নূন্যতম গুঞ্জনও না থাকত, তবুও প্রসিকিউশনের মামলার এই শোচনীয় রূপ দেখার পর তিনি স্বাধীনভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মামলাটি সম্পূর্ণ খারিজ করার পক্ষেই আদালতে সওয়াল করতেন।

সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশ যেভাবে একপেশে প্রচার চালাচ্ছিল, তা নিয়েও মার্কিন সরকারের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। আদালতকে দেওয়া নথিতে বেনামি বা অজ্ঞাত পরিচয় সূত্রের মাধ্যমে সরকারি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে লেখা বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান ও প্রাক্তন কিছু সরকারি কর্তার দ্বারা সংবেদনশীল বিষয়ের গোপনে বাইরে পাচার করা নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনও মর্যাদাপূর্ণ আদালতেরই উচিত নয় জল্পনামূলক এবং উত্তেজনাপূর্ণ সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করে বিচার শেষ করা। বিশেষ করে যেখানে খবরগুলি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি বা বেনামি সূত্রের মনগড়া দাবির ওপর ভর করে তৈরি হয়। বিচার প্রক্রিয়ার নিজস্ব একটি গরিমা রয়েছে যা নিছক রোমাঞ্চের বশে ধ্বংস করা যায় না।

তবে মার্কিন প্রশাসন আরও যোগ করেছে যে, স্বার্থান্বেষী মহলের চালানো এই কুৎসা এবং মামলার অভ্যন্তরীণ তথ্য বাইরে ফাঁস করার নোংরা চক্রান্তটি শেষ পর্যন্ত ব্যুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে এসেছে। এই অপচেষ্টার কারণেই বিচার বিভাগ প্রকাশ্য আদালতে আদানির বিরুদ্ধে নেওয়া সওয়াল-জবাবের মধ্যে থাকা গভীর আইনি অসঙ্গতি এবং ধ্বংসাত্মক খামতিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জনসমক্ষে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য হয়েছে।

যার ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে এই মামলায় কোনও কূটনৈতিক অনুকম্পা বা গোপন কোনও বোঝাপড়া কাজ করেনি। বরং তদন্তকারী দলের মারাত্মক আইনি ব্যর্থতা উন্মোচনের ফলেই সরকার পক্ষকে পিছু হঠতে হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও আইন ব্যবস্থার কঠোর নিয়মাবলীকে কোনও রকমের রাজনৈতিক বা অনৈতিক প্রচার মাধ্যমের নোংরা চালের কাছে যে নতি স্বীকার করতে দেওয়া যাবে না, তা প্রমাণিত হয়েছে।

এই সামগ্রিক আইনি পরিস্থিতির চূড়ান্ত সমাপ্তি টানতে গিয়ে মার্কিন বিচার বিভাগ সাধারণ নাগরিক এবং বিশ্বের বাজার মহলকে সস্তা দরের বিভ্রান্তিকর জল্পনার বিপরীতে আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি রেকর্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। সব মিলিয়ে, আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিলের এই ঘটনাটি প্রমাণ করল যে, দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনার পরই কেবলমাত্র অকাট্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়েই মার্কিন বিচার বিভাগ তার শেষ রায় ঘোষণা করে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+