ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিতে নতুন মাইলফলক! শিবপুরীতে শুরু আদানির বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা
ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়ে বেসরকারি ক্ষেত্রে বড়সড় পা রাখল আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস। মধ্যপ্রদেশের শিবপুরীতে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বেসরকারি সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে এই সংস্থা। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির এই সুবিশাল প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। রবিবার এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের কাজ শুরু হল, যা ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষাকে নতুন শক্তিতে বলীয়ান করবে।
এই নতুন শিল্পোদ্যোগ চালুর ফলে মধ্যপ্রদেশের স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থানে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের হাত ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫,০০০ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে চলেছে। শিবপুরীর এই জমকালো শিলান্যাস অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব, কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এবং উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।

আদানি ডিফেন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিবপুরীর এই নতুন কমপ্লেক্সটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কোনও বেসরকারি শিল্প ইউনিট, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ছাদের নিচেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ থেকে শুরু করে একদম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারোপযোগী মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করা হবে এখানে। এই উদ্যোগ সফল হলে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সমরাস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর ভারতের নির্ভরতা বিপুল পরিমাণে কমবে।
এই কারখানাটিতে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনই নয়, এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত কম্পোজিট প্রোপেল্যান্ট, টিএনটি (TNT) এবং উচ্চমানের বিস্ফোরক সামগ্রীও এই শিবপুরী ইউনিটেই তৈরি হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই অত্যন্ত জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ভারতের আকাশসীমা সুরক্ষায় নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও রণকৌশলগত হাতিয়ার জোগাতে এই কেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া দেশীয় স্তরে ছোট উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এই প্রকল্পে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। আদানি ডিফেন্সের এই শিবপুরী ইউনিট সংলগ্ন অঞ্চলে সমরাস্ত্র তৈরির একটি নিশ্ছিদ্র সাপ্লাই চেন বা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশের আনুমানিক ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে (MSME) যুক্ত করা হবে। এর ফলে স্থানীয় স্তরে ছোট ছোট শিল্পোৎপাদকরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনই সামগ্রিক শিল্প প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে।
শিবপুরীর প্রস্তাবিত এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পটি মধ্যপ্রদেশ রাজ্যকে দেশের অন্যতম প্রধান সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারক অঞ্চল হিসেবে মর্যাদার আসনে বসাবে। এই প্রসঙ্গে আদানি ডিফেন্সের ডিরেক্টর জিৎ আদানি জানিয়েছেন, এই সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়াকে নিখুঁত করতে তাদের সংস্থা ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) এবং সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করে চলেছে।
নজিরবিহীনভাবে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে আদানি ডিফেন্সের ইতিমধ্যেই একটি বিশাল আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণের পরিকাঠামো রয়েছে। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক লাইট মেশিন গান (LMG), আধুনিকমানের কার্বাইন ও শক্তিশালী অ্যাসল্ট রাইফেল তৈরি করা হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১১ মাস আগেই ভারতীয় সেনাকে ২,০০০টি লাইট মেশিন গান সরবরাহ করে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে এই সংস্থা। এখন গোয়ালিয়র এবং শিবপুরী একযোগে ভারতের সমরাস্ত্র উদ্ভাবনের প্রধান জোড়া কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
শিবপুরীতে ২,৫০০ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প আসলে মধ্যপ্রদেশ জুড়ে আদানি গোষ্ঠীর বিস্তৃত বিনিয়োগের একটি অংশ মাত্র। গত বছর ভোপালে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টরস সামিটে আদানি গোষ্ঠীর তরফ থেকে মধ্যপ্রদেশে ১.১ লক্ষ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই বিপুল লগ্নি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার লক্ষ্য হল মধ্যপ্রদেশের প্রায় ১.২ লক্ষ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করা।
উন্নয়নের এই রোডম্যাপের আওতায় ইতিমধ্যেই কাটনি জেলায় আমেথা ও কাইমোর সিমেন্ট কারখানায় ৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে এই শিল্প গোষ্ঠী। এর পাশাপাশি গুনা জেলায় অতি সম্প্রতি প্রায় ১,০৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া নতুন সিমেন্ট প্রকল্পটি এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প বিনিয়োগ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও রাজ্যের প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটাচ্ছে আদানি পাওয়ার এবং আরও ৫,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণের কাজ এই মুহূর্তে জোরকদমে চলছে।
এর বাইরেও রাজ্যের লাহেরি, ধর, রতলাম ও উজ্জয়িনীতে পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনে একাধিক বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছে এবং উজ্জয়িনীতে আর একটি নতুন সিমেন্ট কারখানা স্থাপনের প্রস্তাবিত কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। শিবপুরীর এই নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগটি আদানি গোষ্ঠীর ভারী শিল্প বিনিয়োগে এক নয়া মাত্রা যুক্ত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধিতেও এক নতুন গতি সৃষ্টি করবে বলে শিল্পমহল মনে করছে।
শিবপুরীর এই সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগটি ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে যুগের উপযোগী পদক্ষেপ। এটি যেমন একদিক থেকে দেশের গর্বের 'মেক ইন ইন্ডিয়া' এবং 'আত্মনির্ভর ভারত' অভিযানকে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দেবে, তেমনই ভারতীয় সামরিক শক্তিকে কৌশলগতভাবেও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবে। সরকারের সহযোগিতা এবং বেসরকারি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শিবপুরী আগামী দিনে সমরাস্ত্র উৎপাদনের গৌরবোজ্জ্বল ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে।












Click it and Unblock the Notifications