বারুইপুরের ঘটনার পরই কড়া পদক্ষেপ! রাজ্যের সমস্ত বেআইনি মদের ঠেক ভাঙতে নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
বারুইপুরে নাবালিকা নির্যাতন ও খুনের ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা মূল কারণগুলিকে চিহ্নিত করে এবার অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল প্রশাসন। রাজ্যের সমস্ত বেআইনি মদের ঠেক এবং মাদক ব্যবসার জাল পুরোপুরি গুটিয়ে ফেলতে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই ধরনের সামাজিক ব্যাধিকে সমূলে বিনষ্ট করতে রাজ্যজুড়ে দুই সপ্তাহের এক বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য রাজ্য পুলিশের ডিজিপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিন বারুইপুর সফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত নাবালিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন এবং তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানান। এরপর, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনার জেরে গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। এই দুই পরিবারের গভীর শোকে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করার পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বারুইপুরের সূর্যপুরে একটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বারুইপুরের অপরাধের পিছনে মূল কারণ হল বেআইনি মাদক ও মদের ঠেকগুলির দাপট। তাঁর মতে, মদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং গাঁজা, চরস বা অন্যান্য মাদকের সহজলভ্যতা যুব সমাজকে মারাত্মকভাবে বিপথগামী করছে এবং সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করছে।
এই উদ্বোধনী মঞ্চ থেকেই রাজ্যজুড়ে মাদক ও বেআইনি মদের আস্তানার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পুলিশের এই বিশেষ অভিযানে কোনওরকম সামাজিক ও রাজনৈতিক আপস বরদাস্ত করা হবে না। আগামী দুই সপ্তাহ রাজ্যজুড়ে একটানা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে পুলিশ প্রশাসন। গ্রামীণ এলাকা থেকে শুরু করে শহরতলি—কোথাও যাতে এই সমাজবিরোধী কাজ চলতে না পারে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ব্যাপক অভিযান সফল করতে পুলিশের বিশেষ ব্যাটালিয়নের জওয়ানদের সরাসরি ময়দানে নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণ পুলিশ কর্মীদের পাশাপাশি এই সুশিক্ষিত ও দক্ষ জওয়ানরা মাঠে নামলে বেআইনি মাদক কারবারিদের আস্তানাগুলি পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সহজ হবে। স্থানীয় স্তরে গোয়েন্দাদের কার্যকারিতা বাড়িয়ে অপরাধের উৎসস্থলগুলিকে দ্রুত চিহ্নিত করার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লড়াইটিকে কেবল প্রশাসনিক স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক রূপ দেওয়ার ডাক দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিজের এলাকায় কোনও বেআইনি মদের ঠেক কিংবা গাঁজা-চরসের ব্যবসার খবর জানতে পারলে সরাসরি পুলিশকে জানান। সাধারণ নাগরিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তথ্যদাতার নাম সম্পূর্ণ গোপন রাখবে বলে পুলিশ প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, রাজ্য জুড়ে সক্রিয় থাকা বেঙ্গল এসটিএফ (স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) প্রতিদিন সাহসিকতার সাথে কাজ করছে। ট্রেন, দূরপাল্লার বাস এবং বিভিন্ন আন্তঃরাজ্য সীমানায় লাগাতার অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করছে তারা। তবে এই মহাসড়ক ও রেলের অভিযানের পাশাপাশি এখন জেলা স্তরের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা চক্রগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, বারুইপুরের ঘটনার পিছনে কার্য ও কারণের স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। বেআইনি নেশার আস্তানাগুলিই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এই সামাজিক দূষণ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারলে নারীদের নিরাপত্তা এবং যুবশক্তির সুস্থ বিকাশ বজায় রাখা কঠিন। সুতরাং, প্রতিটি বেআইনি ঠেক ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ অত্যন্ত জোরালোভাবে কার্যকর করা শুরু হয়েছে।
রাজ্যজুড়ে আগামী দুই সপ্তাহের বিশেষ অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে এবং পুলিশের কোন কোন বিভাগ এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে, তা সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হল।
| বিভাগ/পদক্ষেপ | মূল দায়িত্ব ও কাজের ক্ষেত্র |
|---|---|
| রাজ্য পুলিশ ও ডিজিপি | অভিযানের সার্বিক পর্যবেক্ষণ এবং জেলা স্তরে সমন্বয়। |
| বিশেষ ব্যাটালিয়ন | স্পর্শকাতর এলাকায় চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালানো। |
| বেঙ্গল এসটিএফ | রেল ও বাসে বড় বড় মাদক কারবারীদের ধরা। |
| জনসাধারণের অংশগ্রহণ | পুলিশকে গোপন তথ্যের মাধ্যমে সাহায্য করা। |
বারুইপুরের সূর্যপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধনের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সঙ্কটের অবসান হতে চলেছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ছিল, ওই অঞ্চলে রাতের দিকে অপরাধমূলক কার্যকলাপ এবং সমাজবিরোধীদের আনাগোনা বাড়ছিল। এবার স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি এবং নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ বোধ করছেন বাসিন্দারা। পুলিশ প্রশাসনও জানিয়েছে, এই ফাঁড়ি চালু হওয়ার পর ওই এলাকায় নজরদারি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কড়া পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে সামাজিক সুরক্ষায় কোনও ধরনের অবহেলা দেখানো হবে না। অপরাধের গভীরে গিয়ে সামাজিক কুপ্রভাব রোধ করার এই প্রশাসনিক তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে। নবান্নের জারি করা এই নতুন নির্দেশিকা প্রতিটি এলাকায় যেন কড়াভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে বিষয়ে উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের ওপরেও নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে।
সমাজ থেকে মাদকের থাবা দূর করার এই প্রশাসনিক লড়াই আগামী দিনে কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে সকলের। ক্ষতিকর আসক্তি মুক্ত করে একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পুলিশ ও জনসাধারণের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা একযোগে চললে বাংলার আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আরও সুরক্ষিত হয়ে উঠবে, একথা বলাই বাহুল্য।












Click it and Unblock the Notifications