ভিয়েতনামের সমুদ্রে স্পিডবোট উল্টে প্রাণ হারালেন ১৫ জন ভারতীয় পর্যটক

ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ফু কোক দ্বীপের কাছে ভারতীয় পর্যটক বোঝাই একটি স্পিডবোট উল্টে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। স্পিডবোটটিতে মোট ৩২ জন ভারতীয় যাত্রী এবং ৪ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। স্থানীয় উদ্ধারকারী দল দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সমর্থ হলেও ১৫ জনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ জুলাই দুপুরে পর্যটকবাহী এই স্পিডবোটটি মূলত ওশেন পেয়ার আইল্যান্ড কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত একটি সাধারণ দ্বীপাঞ্চল ভ্রমণের ট্যুরে অংশ নিয়েছিল। বোটটি পর্যটকদের নিয়ে হর্ন মে রুত থেকে আন থোই বন্দরের দিকে ফিরছিল। হর্ন মে রুত এনগোয়াই থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে মাঝসমুদ্রে আচমকাই প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় বোটটি উল্টে যায় এবং সমস্ত আরোহী ছিটকে সমুদ্রে পড়ে যান। কাছাকাছি থাকা অন্য কয়েকটি পর্যটকবাহী বোট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।

Rescue operations after tragic speedboat capsizing in Vietnam

ভিয়েতনামে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস এই দুঃখজনক ঘটনার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগাযোগ বজায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয় নাগরিকদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক তথ্য ও সহায়তা দেওয়ার জন্য হ্যানয় এবং হো চি মিন সিটিতে বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সব ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিনিধিরা ভিয়েতনামের স্থানীয় প্রশাসনের পাশে রয়েছেন।

জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য হো চি মিন সিটিতে ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেলের পক্ষ থেকে তিনটি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর প্রকাশ করা হয়েছে। নাম্বারগুলো হলো: +৮৪ ৩৬ ২৮১ ৭৯৩০, +৮৪ ৯১ ৫৫২ ৩৭ ১৪ এবং +৮৪ ৩৩ ৪৫২ ০৪১৪। এছাড়া ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে স্থাপিত কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য +৮৪ ৯১ ৩০৮ ৯১৬৫ নম্বরটি ব্যবহার করা যাবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের যেকোনো প্রয়োজনে বা তথ্যের খোঁজে এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

ভিয়েতনামের এই অপ্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় লিখেছেন যে, ভিয়েতনামে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ও কনস্যুলেট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ক্ষতিগ্রস্তদের সম্ভাব্য সমস্ত ধরনের সহায়তা প্রদানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নয়াদিল্লির বিদেশ দপ্তর থেকেও এই মর্মান্তিক ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে。

এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্ধ্রপ্রদেশের আইটি ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ন্যারো লোকেশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নয়াদিল্লির অন্ধ্রপ্রদেশ ভবনের বিশেষ কমিশনার ড. অর্জা শ্রীকান্তের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। অন্ধ্রপ্রদেশের হিন্দুপুরের বাসিন্দা রবি তেজা (৪১) এবং কাদাপার শ্রীধর নামের দুই ভারতীয় পর্যটকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। শ্রীধরের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর তাঁর পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দুর্ঘটনার সময় ওই সমুদ্র সৈকতে কোনো সরাসরি বৃষ্টিপাত না হলেও সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল ছিল বলে স্থানীয় বোট চালকেরা জানিয়েছেন। যে দ্বীপটিতে পর্যটকেরা বেড়াতে গিয়েছিলেন, সেটি মনোরম সাদা বালির সৈকত এবং প্রবাল প্রাচীরের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। তবে রুক্ষ আবহাওয়ার মধ্যে এই ধরনের হালকা স্পিডবোট চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। অভিজ্ঞতার নিরিখে বোটের চালক প্রবীণ হলেও সমুদ্রের তীব্র ঢেউ সামলাতে না পেরেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে।

ভিয়েতনামের বিশেষ পুলিশ প্রশাসন এই ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজতে ইতিমধ্যে মামলা দায়ের করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, বোটটির ভেতরে আটকে থাকার কারণেই অনেক পর্যটককে সময়মতো জীবিত বের করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে, উত্তাল সমুদ্রের পাশাপাশি স্পিডবোটটিতে কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না। পর্যটকদের জীবনহানির ঘটনায় স্থানীয় স্তরে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং দ্বীপে পর্যটক পরিবহনের সুরক্ষাবিধি নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই দুর্ঘটনাটি ঘটে ঠিক এমন এক সময়ে, যখন প্রায় এক বছর আগে ভিয়েতনামের ঐতিহাসিক হা লং বে-তে ঝড়ের কবলে পড়ে একটি বড় পর্যটকবাহী জাহাজ উল্টে গিয়েছিল। ২০২৫ সালের সেই জুলাই মাসের দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ জন যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটেছিল, যার মধ্যে ছিল বহু শিশুও। বারবার এই ধরনের অনভিপ্রেত নৌ দুর্ঘটনা ভিয়েতনামের পর্যটন পরিকাঠামো এবং জলপথের নিরাপত্তা নীতিমালার খামতিগুলোকে তুলে ধরছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সুরক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করায়।

বর্তমানে ভিয়েতনাম প্রশাসনের তরফে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও জারি রয়েছে। ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রক ও অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের কর্মকর্তারা প্রতিটি নিহত ভারতীয়ের পরিচয় সঠিকভাবে যাচাইয়ের পর তাঁদের মরদেহ উন্নত বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন। স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আহতদের প্রয়োজনীয় সব আইনি ও চিকিৎসার সাহায্য নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক স্তরে দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা জোরালোভাবে চালানো হচ্ছে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+