Get Updates
Get notified of breaking news, exclusive insights, and must-see stories!

রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী: এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সময়ে তাঁর শিক্ষা মনে পড়ছে

আজ ২৫শে বৈশাখ, বাঙালির 'বাঙালিয়ানা দিবস'। আজ থেকে ১৫৮ বছর পূর্বে বঙ্গের ঊর্বর ভূমিতে জন্মেছিলেন এক মহামনীষী, নাম তাঁর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আজ ২৫শে বৈশাখ, বাঙালির 'বাঙালিয়ানা দিবস'। আজ থেকে ১৫৮ বছর পূর্বে বঙ্গের ঊর্বর ভূমিতে জন্মেছিলেন এক মহামনীষী, নাম তাঁর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন করে কচকচানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং এই লেখার প্রধান কারণ হচ্ছে আজকের ভারতে মানুষটির প্রাসঙ্গিকতা কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তার বিশ্লেষণ খোঁজা।

বর্তমান সময়ে ভারতে যখন অতি-জাতীয়তাবাদের জিগির ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, তথাকথিত উদারপন্থীদের প্রায় আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, সেখানে রবীন্রনাথের জীবনদর্শনের কথা আরও একবার মনে করা আশু প্রয়োজন বইকি। আর কয়েকদিন পরেই চলতি লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরোবে এবং তার উপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনের ভারত কোন পথে এগোবে। যদি জাতীয়তাবাদী জিগির আরও উগ্র হয়ে ওঠে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার উপরে নেমে আসে তরবারির আঘাত, তবে ভবিষ্যতের দিনগুলি যে খুব অস্বস্তিজনক হবে না, তা বুঝতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না।

আর এখানেই রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক, জন্মের দেড়শো বছরের উপর পার করেও। তাঁর জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনে দেওয়া একটি ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: "জাতীয়তাকে আমরা পরম পদার্থ বলে পূজা করি নে এইটেই হচ্ছে আমাদের জাতীয়তা"।

কথাটির গভীরতা আজকের অতি-জাতীয়তাবাদের কারবারিরা কতটা বুঝবেন জানা নেই কিন্তু ভারতের আত্মাকে বোঝার মূল চাবিকাঠি যে এই কথাগুলির মধ্যেই নিহিত, তা অনস্বীকার্য।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষণে আরও বলেছিলেন যে ভারতের কতগুলি বিশেষ সংস্কার ও লোকাচারের মধ্যে স্বজাত্যের অভিমানকে সীমাবদ্ধ ও অত্যুগ্র করে তোলার পন্থাকে তিনি ন্যাশনাল শিক্ষা বলে স্বীকার করতে রাজি নন।

উৎকট ব্যায়াম করলেই যোগসাধনা হয় না; আজকের ফ্যাশনেবল যোগসাধনাকারীরা কি জানেন?

উৎকট ব্যায়াম করলেই যোগসাধনা হয় না; আজকের ফ্যাশনেবল যোগসাধনাকারীরা কি জানেন?

প্রাচীন ভারতের তপোবনের মহাসাধনার কথা এবং চতুর্প্রান্তে তার ডালপালা বিকাশের কথাকে উল্লেখ করে রবি ঠাকুর বলেন যোগসাধনার কথা। তিনি বলেন যে সেই সাধনা আসলে যোগসাধনা এবং মনে করিয়ে দেন যে যোগসাধনা কোনও "উৎকট শারীরিক মানসিক ব্যায়ামচর্চা নয়"।

রবীন্দ্রনাথের কথায়: "যোগসাধনা মানে সমস্ত জীবনকে এমনভাবে চালনা করা যাতে স্বাতন্ত্রের দ্বারা বিক্রমশালী হয়ে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য না হয়, মিলনের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠাকেই আমরা চরম পরিণাম বলে মানি, ঐশ্বর্যকে সঞ্চিত করে তোলা নয়, আত্মাকে সত্যে উপলব্ধি করাই আমরা সফলতা বলে স্বীকার করি।"

আমাদের দেশে এখন যোগ সংস্কৃতির এক প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আজকাল প্রবল ঢক্কানিনাদ সহকারে রাজপথে বসে পড়েন যোগসাধনা করতে। কিন্তু রবি ঠাকুরের কথা মানলে, যোগসাধনা উৎকট ব্যায়াম চর্চা করলেই সফল হয় না; তার জন্যে প্রয়োজন মিলনাত্মক মানসিকতাও। গত পাঁচ বছরে ভারতে মিলনের উদাহরণ কতবার দেখা গিয়েছে, তা বোধহয় একটি শিশুও বলতে পারবে।

রবিঠাকুর দেখিয়েছিলেন আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সভ্যতার গৌরবময় তারতম্য

রবিঠাকুর দেখিয়েছিলেন আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সভ্যতার গৌরবময় তারতম্য

আমেরিকার সভ্যতার অগ্রগতির তুলনা এনেও রবীন্দ্রনাথ ভারতের সভ্যতার আত্মাকে প্রস্ফুটিত করে তুলেছিলেন। বলেছিলেন: "আমেরিকার অরণ্যে যে তপস্যা হয়েছে তার প্রভাবে বনের মধ্যে থেকে বড়ো বড়ো শহর ইন্দ্রজালের মতো জেগে উঠেছে। ভরতবর্ষেও তেমন করে শহরের সৃষ্টি হয় নি তা নয়, কিন্তু ভারতবর্ষ সেইসঙ্গে অরণ্যকেও অঙ্গীকার করে নিয়েছিল। অরণ্য ভারতবর্ষের দ্বারা বিলুপ্ত হয় নি, ভারতবর্ষের দ্বারা সার্থক হয়েছিল; যা বর্বরের আবাস ছিল তাই ঋষির তপোবন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমেরিকায় অরণ্য যা অবশিষ্ট আছে তা আজ আমেরিকায় প্রয়োজনের সামগ্রী, কোথাও বা তা ভোগের বস্তুও বটে, কিন্তু যোগের আশ্রম নয়।"

"অরণ্যকে নব্য আমেরিকা আপনার বড়ো জিনিস কিছুই দেয় নি, অরণ্যও তাকে আপনার বড়ো পরিচয় থেকে বঞ্চিত করেছে। নূতন আমেরিকা যেমন তার পুরতন অধিবাসীদের প্রায় লুপ্তই করেছে, আপনার সঙ্গে যুক্ত করে নি, তেমনি অরণ্যগুলিকে আপনার সভ্যতার বাইরে ফেলে দিয়েছে তার সঙ্গে মিলিত করে নেয় নি। নগর-নগরীই আমেরিকার সভ্যতার প্রকৃত নিদর্শন- এই নগর-স্থাপনার দ্বারা মানুষ আপনার স্বতন্ত্র্যের প্রতাপকে অভ্রভেদী করে প্রচার করেছে। আর তপোবনই ছিল ভারতবর্ষের সভ্যতার চরম নিদর্শন; এই বনের মধ্যে মানুষ নিখিল প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার মিলনকেই শান্তসমাহিতভাবে উপলব্ধি করেছে।"

সারা দেশকে একই ধাঁচে ফেলে দেওয়ার এই সংকীর্ণতা রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করত

সারা দেশকে একই ধাঁচে ফেলে দেওয়ার এই সংকীর্ণতা রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করত

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের মন্ত্রকে রবীন্দ্রনাথের মতো গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে খুব বেশি লোক দেখেননি। আজ যেভাবে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে সারা দেশের মানুষকে একই সাংস্কৃতিক ধাঁচে ফেলে দেওয়ার জোর প্রকল্প চলছে, জয় শ্রীরাম স্লোগান নিয়ে প্রবল বাগ্বিতণ্ডা চলছে যেখানে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ হেলদোল নেই শাসকের সেখানে রবীন্দ্রনাথের কথাগুলি কানে আরও বেশি করে বাজে। আমরা আমাদের বৈচিত্র্যের শক্তিকে সম্বল করে যেখানে আরও বেশি কৃতিত্বের দিকে এগোতে পারি, সেখানে দেশের মধ্যেই জাতীয়তাবাদী জিগির তুলে বিভাজন সৃষ্টি করে আমরা কী প্রমান করতে চাইছি?

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবিকতার পূজারী, সৌন্দর্যের সেবক। নিজের প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে আজকে যে রাজনৈতিক-সামাজিক আবহ তৈরী হয়েছে, তা দেখে তিনি কতটা কষ্ট পেতেন, সেকথা আমাদের কল্পনারও অতীত। আন্তর্জাতিক মননের মানুষটি আজকের এই সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা দেখলে নিঃসন্দেহে গর্জে উঠতেন তাঁর লেখনীর দ্বারা, যেমনটি উঠেছিলেন একসময়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে; কিন্তু তিনি যেহেতু আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, তাই তাঁর দেখিয়ে যাওয়া শিক্ষা ও পথই আমাদের পাথেয়, আজকের এই অস্থির সময়ে।

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতিগুলি আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত]

More From
Prev
Next
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+