বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুন! অভিযুক্তদের বয়ানে বড় অসঙ্গতি, বাড়ল গ্রেফতারির সংখ্যা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার দিনভর নজিরবিহীন উত্তেজনা ছড়ায়। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা ঘটনার বিচার এবং অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে দফায় দফায় লাঠিচার্জ করতে হয় পুলিশকে। রবিবার দুপুর থেকেই এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। দোষীদের দ্রুত শাস্তির ব্যাপারে প্রশাসনিক স্তর থেকে আশ্বাস দেওয়ার পরেই সক্রিয়তা আরও বাড়ে এবং সন্ধ্যা থেকেই একের পর এক কড়া পদক্ষেপ শুরু হয়।
বারুইপুর থানার পুলিশের সঙ্গে রাতভর বিশেষ অভিযানে শামিল হন রাজ্য পুলিশের টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) সদস্যরা। বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মূল অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার পাশাপাশি মূল অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়ার এবং তথ্য গোপনের অভিযোগে মধ্যরাতে আরও তিনজনকে পুলিশ আটক করেছে। ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে একটি ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তদন্তে নতুন মোড় ও ধৃতদের অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান
পুলিশ সূত্রে খবর, রবিবার গভীর রাতে ধৃত ও আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুখোমুখি বসিয়ে দীর্ঘক্ষণ ম্যারাথন জেরা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় এক অভিযুক্ত দাবি করে, ওই নাবালিকাকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ আদায়ের একটা যৌথ পরিকল্পনা ছিল তাদের। সেই লক্ষ্য পূরণ করতেই তারা নাবালিকাকে একটি নির্জন জায়গায় আটকে রেখেছিল। তবে অভিযুক্তদের এই বয়ান নিয়ে প্রথম থেকেই ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বারুইপুর জেলা পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকরা।
তদন্তকারী পুলিশ অফিসাররা নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ঘটনার দিন বা তার পর থেকে পরিবারের কাছে কোনও ধরনের মুক্তিপণ চেয়ে ফোন বা হুমকি যায়নি। ফলে ধৃতদের এই বয়ান পুরোপুরি সাজানো এবং তদন্তকে ভুল পথে চালিত করার একটি কৌশল বলেই মনে করছে পুলিশ। ধৃতদের বয়ানে একাধিক অসঙ্গতির জেরে ঘটনার আসল উদ্দেশ্য জানতে সোমবারই তাদের বারুইপুর আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাতে চলেছে পুলিশ প্রশাসন।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে বারুইপুর থানার পুলিশ এই ঘটনায় মোট তিনটি পৃথক মামলা রুজু করেছে। প্রথম মামলাটি দায়ের হয়েছে নাবালিকাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের নির্দিষ্ট জামিন অযোগ্য ধারায়। দ্বিতীয় মামলাটি করা হয়েছে এলাকায় বিক্ষোভের নামে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো এবং আইনরক্ষকদের ওপর অতর্কিত হামলার দায়ে। এছাড়া তৃতীয় মামলাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ উত্তপ্ত জনতার গণপিটুনিতে এক অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় একটি পৃথক খুনের মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
রাজনৈতিক চাপানউতোর ও বিচারের আশ্বাস
ভয়াবহ এই ঘটনার রেশ পৌঁছেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও। রবিবারই নির্যাতিতা নাবালিকার বাবার কাছে ফোনে সরাসরি যোগাযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি শোকগ্রস্ত পরিবারকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে অপরাধীদের কোনওভাবেই রেয়াত না করার কড়া বার্তা দেন। প্রশাসন কীভাবে এই মামলার তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট করার পাশাপাশি আগামী মঙ্গলবার নির্যাতিতার পরিবারকে ভবানীভবনে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় মৃতাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাতেই ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভিডিও কলের মাধ্যমে কান্নায় ভেঙে পড়া নির্যাতিতার মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং সান্ত্বনা দেন। এই জঘন্য কাণ্ডের অপরাধীরা যাতে কোনও ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীদের দ্বারস্থ হয়ে আইনি লড়াই চালানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বারুইপুরের এই মারাত্মক কাণ্ড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ সায়নী ঘোষ। ফেসবুকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এই বিশিষ্ট রাজনীতিক লেখেন, এমন একটি পাশবিক ঘটনায় তিনি অত্যন্ত স্তম্ভিত এবং গভীরভাবে মর্মাহত। তদন্ত প্রক্রিয়া যাতে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন এবং দ্রুত গতিতে শেষ হয়, সেই বিষয়ে তিনি নিজেও ব্যক্তিগত স্তরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে উল্লেখ করেন।












Click it and Unblock the Notifications