বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ-খুনে রণক্ষেত্র এলাকা, সিট গঠন রাজ্যের

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার রাজ্য জুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ থাকা ১১ বছরের এক নাবালিকার দেহ রবিবার ভোরে একটি পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়ার পরেই এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও ঘটনার দ্রুত তদন্তে বারুইপুর জেলা পুলিশ তড়িঘড়ি একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT) গঠন করেছে।

রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে সক্রিয় তৎপরতা দেখা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং আগামী মঙ্গলবার পরিবারটিকে ভবানীভবনে ডেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

Police investigation underway at Baruipur crime scene

গণবিক্ষোভ, পথ অবরোধ ও ভাঙচুর

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রের খবর, শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাননি। রবিবার ভোরে বাড়ির কাছেরই একটি পুকুরে তার নিথর দেহ ভাসতে দেখা যায়। নাবালিকার মৃত্যু এবং তাকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এলাকার শান্তি বিঘ্নিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে।

ক্ষুব্ধ জনতা দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে মৃতদেহ রাস্তায় রেখে কুলপি রোডে ব্যাপক পথ অবরোধ শুরু করে। রাস্তায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে পথ আটকে দেওয়ায় দীর্ঘ সময়ের জন্য যানবাহন চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ঘটনার আঁচ পড়ে স্থানীয় ট্রেন চলাচলেও। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নামখানা লাইনে প্রায় এক ঘণ্টা রেল অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয়, যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা বিপাকে পড়েন।

বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই ছিল যে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মীরা ক্ষুব্ধ জনতাকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলে তাদের ওপরও চড়াও হন বিক্ষোভকারীরা। কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিকদের লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি করা হয় এবং পুলিশের একাধিক গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ। উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাহিনীকে দীর্ঘক্ষণ বেগ পেতে হয় এবং পুরো এলাকা জুড়ে এক থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়।

আইন হাতে তুলে নেওয়া ও গণপিটুনি

গণবিক্ষোভের মাঝেই এই মামলায় এক অন্য মোড় নেয় যখন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে ধরে ফেলে। পুলিশ সূত্রের খবর, উত্তেজিত জনতার ব্যাপক মারধরের জেরে ঘটনাস্থলেই এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। পুলিশকে না জানিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনাটি চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলে ধর্ষণ মামলার সমান্তরালে এই বেআইনি পিটিয়ে খুনের ঘটনাকেও প্রশাসন গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

এই গণপিটুনির ঘটনার প্রেক্ষিতে বারুইপুর থানার পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করা হবে না। ধর্ষণ ও খুনের মূল অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি যারা সাধারণ নাগরিক হয়ে আইন ভঙ্গ করে এই হিংসাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদেরও ভিডিও ফুটেজ দেখে এবং স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নিয়ে চিহ্নিত করা হবে।

তদন্তে পুলিশের বিশেষ দল গঠন

পরিস্থিতি পুলিশের হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় রবিবার সন্ধ্যায় বারুইপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি সিট বা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। এই তদন্তকারী দলের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো ফাঁক না রেখে দ্রুত চার্জশিট পেশ করা সম্ভব হয়।

এখনও পর্যন্ত এই নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পেছনের আসল রহস্য এবং অন্য কেউ এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধৃতদের আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ, যাতে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রটি দ্রুত উন্মোচন করা যায়।

বারুইপুর থানায় সব মিলিয়ে মোট তিনটি ভিন্ন মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রথমটি মূল অপরাধ অর্থাৎ নাবালিকাকে পাশবিক নির্যাতন ও খুনের মামলা। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নষ্ট করা, পুলিশের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো এবং ট্রেন ও রাস্তা অবরোধ করার অভিযোগে। তৃতীয় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে উত্তেজিত জনতার দ্বারা এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আইন বহির্ভূতভাবে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগে।

এলাকায় মোতায়েন পুলিশ বাহিনী

বর্তমানে ঘটনার গুরুত্ব ও তীব্র উত্তেজনা বিবেচনা করে বারুইপুর এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের নতুন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে নিয়মিত রুট মার্চ করা হচ্ছে। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারা এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার পাশাপাশি পুলিশি তদন্তের ওপর ভরসা রাখতে আবেদন জানিয়েছেন।

নাবালিকা নির্যাতনের বিচার চেয়ে মানুষ যে দাবি তুলছেন, প্রশাসন তার প্রতি সম্পূর্ণ সহানুভূতিশীল। তবে এই ধরনের ঘটনায় যাতে কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তি আক্রান্ত না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যাতে আইনের হাত গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+