মেলবোর্নে মোদীর সফর ঘিরে চাঞ্চল্য! সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাণনাশের হুমকি, নড়েচড়ে বসল অস্ট্রেলীয় প্রশাসন
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন সফরের ঠিক আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সমাজমাধ্যমে খুনের হুমকি দেওয়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। আগামী ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী মোদীর মেলবোর্নে পৌঁছনোর কথা রয়েছে। এই পরিকল্পিত সফরকে নিশানা করে ছড়ানো অনলাইনের এই হুমকি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে অস্ট্রেলীয় প্রশাসন।
ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) এই গুরুতর বিষয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তের সূত্র ধরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে যে, পুলিশ বিতর্কিত মন্তব্যটির উৎস ও তার সঙ্গে যুক্ত ইন্টারনেট প্রোটোকল বা আইপি অ্যাড্রেস শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই হুমকির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

এই হুমকি কোথায় এবং কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানা গিয়েছে যে ঘটনাটি ঘটেছে সমাজমাধ্যমের একটি প্ল্যাটফর্মে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৯ জুলাই মেলবোর্নের ঐতিহ্যবাহী 'মার্ভেল স্টেডিয়াম’-এ 'মেলবোর্ন মিটস মোদী’ নামক প্রবাসীদের একটি বর্ণাঢ্য মিলনোৎসব বা নাগরিক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
ফেসবুকের একটি ওয়ালে এই বিশেষ নাগরিক সংবর্ধনা সভার প্রচার ও আমন্ত্রণ সম্পর্কিত একটি পোস্ট করা হয়েছিল। অভিযোগ, সেই পোস্টের মন্তব্য বক্সে এসে এক জন ব্যবহারকারী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে প্রাণনাশের হুমকি দেন। অসামাজিক উপাদানগুলি যাতে এই কর্মসূচিতে কোনও বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তার জন্য স্থানীয় ভারতীয় ও অস্ট্রেলীয় কমিউনিটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ করা হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার 'আবু মুস্তাফা’ নামক একটি প্রোফাইল থেকে পোস্ট হওয়া মন্তব্যটিতে সরাসরি লেখা হয়, “অনুষ্ঠান চলাকালীন স্টেডিয়ামের ছাদ যেন বন্ধ রাখা হয়, অন্যথায় নিজের মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই তিনি অস্ট্রেলিয়ায় আসছেন।” একটি জনবহুল প্রকাশ্য স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে এভাবে সরাসরি করা হুমকির পোস্টটি নজরে আসতেই তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম 'দ্য অস্ট্রেলিয়া টুডে’-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এই আপত্তিকর মন্তব্যটি সমাজমাধ্যমে দৃশ্যমান হওয়ার দিনই অবিলম্বে তা অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রশাসনের তরফে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে দ্রুত সাড়া দিয়ে অপরাধ দমন বিভাগকে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত একাধিক গোপন সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, পুলিশ ওই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং সংশ্লিষ্ট হুমকির উৎস হিসেবে নির্দিষ্ট আইপি ঠিকানাটি খুঁজে বের করেছে। অনলাইনে ভুয়ো পরিচয়ের আড়ালে থাকা প্রকৃত ব্যক্তির পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। একই সাথে এই বার্তার পিছনে কোনও বৃহত্তর নাশকতামূলক ছক রয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে।
যদিও কড়া গোপনীয়তা বজায় রেখে চলা এই স্পর্শকাতর তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের তরফে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য বিবৃতি বিবৃতি জারি করা হয়নি। তবে সেদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপ্রধান বা সফরকারী কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশ্যে আসা যে কোনও প্রকার হুমকিকে দেশের আইন মেনেই সর্বোচ্চ স্তরে মোকাবিলা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই হাই-প্রোফাইল সফরের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে মেলবোর্নের মার্ভেল স্টেডিয়ামে এখন চরম তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার ও বিশ্বজুড়ে প্রভাব রয়েছে এমন বিশিষ্ট শীর্ষ নেতার সফরের নিরাপত্তার দায়িত্বে দেশটির ফেডারেল পুলিশ ফোর্স, রাজ্য পুলিশ এবং একাধিক বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দা নিরাপত্তা ইউনিট যৌথভাবে অংশ নেয়।
হুমকির বার্তার পর এই বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে প্রবাসীদের প্রকাশ্য জমায়েতের সময় প্রযুক্তিবহুল নজরদারির পাশাপাশি কৌশলগত সামরিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। মাঠের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি প্রবেশপথ সহ ভিড়ের প্রতিটি মানুষের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকরাও মেলবোর্নে তাঁদের সমকক্ষ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। এর আগের সফরগুলিতেও যখনই সমাজমাধ্যমে বা অফলাইনে এমন কিছু অপ্রীতিকর ইঙ্গিত মিলেছে, তখনই কূটনৈতিক চ্যানেল ও স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে নিশ্ছিদ্র বলয় তৈরি করেছে। ফলে আগামী ৯ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা কাঠামোকে নজিরবিহীন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিক থেকে খুবই বড় মাইলফলক হতে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত সুরক্ষায় ক্যানবেরা ও দিল্লির বন্ধন অত্যন্ত জোরালো হয়েছে। তারই মধ্যে এই সফরকে বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা এক রকমের আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় পড়ে বলে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রবাসী ভারতীয়দের বিশাল একটা বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। অতীতেও মেলবোর্ন এবং সিডনিতে মোদীর অনুষ্ঠানগুলিতে হাজার হাজার প্রবাসী সশরীরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের সুরক্ষাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, সেই কারণেও অস্ট্রেলীয় প্রশাসন কোনও রকম ঢিলেমি বরদাস্ত করতে নারাজ।
ফেডারেল পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে তারা পুরো ভার্চুয়াল পরিকাঠামোর ওপর নজর রাখছে যাতে কোনও উগ্রপন্থী বা ক্ষতিকর গোষ্ঠী প্রচারের সুবিধা না নিতে পারে। মেলবোর্নের মার্ভেল স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ভৌগোলিক মানচিত্রকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রোটোকল মেনে প্রধানমন্ত্রীর আসার আগে থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র থাকবে।
হুমকি মোকাবিলায় সব দিক থেকে প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে হলেও, মেলবোর্নের সমাবেশ ঘিরে ভারতীয় প্রবাসীদের মনে উদ্দীপনার কিন্তু কোনও ঘাটতি দেখা যায়নি। মেলবোর্ন প্রশাসনও জানিয়েছে যে সফরের মূল দিনগুলিতে সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রোটোকল কঠোরভাবে পালন করা হবে এবং তদন্তে অভিযুক্ত চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।












Click it and Unblock the Notifications