ই২০ পেট্রোল নিয়ে আতঙ্ক! গাড়ির ইঞ্জিন কি সত্যিই নষ্ট হচ্ছে? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ভারতের জ্বালানি বাজারে ই২০ (E20) বা ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। বহু গাড়ি ও বাইক চালকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই নতুন জ্বালানি কি তাদের পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি করছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সংশয় দূর করতে এবং বিভ্রান্তি কাটাতে আসরে নেমেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এই ই২০ জ্বালানি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এটি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ইঞ্জিনের কোনও ক্ষতি হয় না। দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষার পরেই এই জ্বালানি বাজারে আনা হয়েছে।

Petrol pump dispenser for E20 blended fuel

ই২০ ফুয়েল ও ইঞ্জিনের ক্ষতি: আসল সত্যিটা কী?

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে গাড়ি শিল্পের প্রতিনিধিরা জানান, ল্যাবরেটরিতে কঠোর পরীক্ষা ও বাস্তব জীবনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে ই২০ পেট্রোল ব্যবহারের কারণে ইঞ্জিনে অতিরিক্ত ক্ষয় বা ক্ষতির কোনও প্রমাণ মেলেনি। বিশেষ করে ২০২৩ সালের আগে তৈরি গাড়ি, যা মূলত ই১০ (E10) জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি হয়েছিল, সেগুলিও এই নতুন ই২০ ফুয়েলে অনায়াসে চলতে পারে।

দেশের বৃহত্তম গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে রাহুল ভারতী জানিয়েছেন, তাঁরা পুরনো ই১০ ক্যাটেগরির গাড়িগুলিকেও ই২০ ফুয়েল দিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরীক্ষা করেছেন। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার খতিয়ে দেখে কোনও অস্বাভাবিকতা পাননি। ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব বা মরচে পড়ার মতো কোনও সমস্যাই সেখানে ধরা পড়েনি।

একই সুর শোনা গেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা টয়োটার কণ্ঠেও। টয়োটা কিরলোস্কর মোটরের প্রতিনিধি বিক্রম গুলাটি জানান, ভারতে গ্রাহকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আগে সেগুলিকে অত্যন্ত কঠিন এবং বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইথানল একটি চমৎকার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, যা কেবল কার্যক্ষমতাই বাড়ায় না, বরং কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সাহায্য করে।

ইউটিউবারের দাবি এবং টয়োটার স্পষ্ট বার্তা

ই২০ পেট্রোল নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওর পর। বিহারের এক ইউটিউবার ও রাজনৈতিক কর্মী মণীশ কাশ্যপ একটি ভিডিওতে দাবি করেন যে, ই২০ পেট্রোল ব্যবহার করার কারণে তাঁর গাড়িটি বিকল হয়ে গিয়েছে এবং ইঞ্জিন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়।

তবে টয়োটার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কারও নাম না করে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ইঞ্জিনের সমস্যার সঙ্গে ই২০ জ্বালানির কোনও যোগসূত্র নেই। গাড়ির ইঞ্জিনে যদি কোনও ত্রুটি এসে থাকে, তবে তা ভেজাল বা দূষিত জ্বালানির জন্য হতে পারে, ইথানল মিশ্রিত পেট্রোলের জন্য নয়। কোনও সরকারি তদন্তেও এমন ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি।

দু-চাকার গাড়ির ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হিরো মোটোকর্পের চিফ বিজনেস অফিসার আশুতোষ বর্মা জানিয়েছেন, তাঁদের সার্ভিস সেন্টারে কোটি কোটি বাইক ও স্কুটারের ডেটা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেই তথ্য অনুযায়ী, ই২০ পেট্রোল চালু হওয়ার পর থেকে ইঞ্জিনের ক্ষতি বা বিকল হওয়ার মতো ঘটনার কোনও বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়নি। অর্থাৎ বাইক চালকদেরও চিন্তার কিছু নেই।

কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীর কড়া চ্যালেঞ্জ

গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ওঠা সমস্ত অভিযোগকে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও হাইওয়ে মন্ত্রী নিতিন গড়করি। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, ই২০ পেট্রোলের কারণে ইঞ্জিন খারাপ হওয়ার খবরগুলি একেবারেই ভুয়ো। মন্ত্রী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, "আমাকে এমন একটি গাড়ি দেখান যা ই২০ পেট্রোলের কারণে নষ্ট হয়েছে।"

সরকার ও গাড়ি উৎপাদকদের দাবি অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রাক্তন সিএমডি বর্তিকা শুক্লা জানিয়েছেন, ভারতের এই ইথানল ব্লেন্ডিং প্রোগ্রাম রাতারাতি বা হঠাৎ করে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে চলা গভীর গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়েছে।

ইথানল মিশ্রণের সুবিধা ও দেশের অর্থনীতি

বর্তিকা শুক্লা আরও উল্লেখ করেন যে, ২০১৩-১৪ সালে ভারতে পেট্রোলে মাত্র ১.৫ শতাংশ ইথানল মেশানো হতো, যা আজ পৌঁছেছে ২০ শতাংশে। এই লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের কথা থাকলেও ভারত তা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই হাসিল করে নিয়েছে। আমেরিকা, ব্রাজিল, কানাডা এবং জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলিও অনেক বছর ধরেই উচ্চ মাত্রায় ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করে আসছে।

ভারত তেল আমদানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের ওপর বিশালভাবে নির্ভরশীল। ইথানল ব্লেন্ডিং বা পেট্রোলে ইথানল মেশানোর মূল উদ্দেশ্য হল অপরিশোধিত তেল আমদানি কমানো এবং দেশের পরিবেশ রক্ষা করা। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ওঠানামা করে, তখন এই ইথানল ভারতের অর্থনীতি তথা সাধারণ গ্রাহকদের পকেটে বাড়তি চাপের হাত থেকে রক্ষা করতে সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।

এছাড়াও ইথানল যেহেতু বিভিন্ন উদ্ভিদজাত উৎস যেমন আখ বা শস্যদানা থেকে তৈরি হয়, সেহেতু এটি একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি। এর ফলে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনার হার বেড়েছে, যা ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষকদের আয়ের একটি নতুন উৎস তৈরি করে দিয়েছে। পরিবেশের দিক থেকেও এটি কার্বন নিঃসরণ অনেকাংশে হ্রাস করতে সক্ষম।

শেষ পর্যন্ত, ই২০ জ্বালানি নিয়ে যে আশঙ্কা ডালপালা মেলেছিল, দেশের শীর্ষ তথ্য ও পরীক্ষা নিরীক্ষা সংস্থা এআরএআই (ARAI) এবং সিয়াম (SIAM)-এর রিপোর্টের পর তা অনেকটাই থিতিয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বিশ্বস্ত ডিলারের কাছ থেকে সঠিক মানের জ্বালানি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+