বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়! হালান্ডের জোড়া গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন রূপকথার জন্ম হল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল নরওয়ে। রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬ তারিখে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে এই ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় ইউরোপের এই দলটি। নরওয়ের এই মহাকাব্যিক জয়ের নায়ক আর কেউ নন, স্বয়ং স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড।

দ্বিতীয়ার্ধের শেষ মুহূর্তের ম্যাজিকে ম্যাচ সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন হালান্ড। ম্যাচের ৮০ এবং ৮৯ মিনিটে দুটি দুর্দান্ত গোল করে তিনি ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে চুরমার করে দেন। পুরো ম্যাচে লড়াই করেও হালান্ডের এই জোড়া ফলার কোনও জবাব খুঁজে পায়নি সেলেকাওরা।

Erling Haaland celebrating goal against Brazil

ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে পেনাল্টিতে গোল শোধ করেন ৬৭ মিনিটে মাঠে নামা নেইমার। তার আগে ম্যাচের শুরুতেই বক্সে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। তবে ভিনিসিয়াস জুনিয়র নিজে না মেরে সেই পেনাল্টি মারতে দেন ব্রুনে গিমারেসকে। আর ব্রুনো সেই পেনাল্টি মিস করেন। তারপর হাজারো সুযোগ পেলেও গোলের মুখ খুলতে পারেনি ব্রাজিল। ওদিকে পাল্টা আক্রমণের ছক সাজিয়ে হালান্ডের নৈপুণ্যে জোড়া গোল তুলে নেয় নরওয়ে। এই জয় নরওয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে হালান্ডের জাদু

ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিল নিজেদের চেনা ছন্দে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল এবং নরওয়ের রক্ষণভাগে অনবরত চাপ সৃষ্টি করছিল। প্রথমার্ধে নরওয়ে মূলত রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলে ব্রাজিলের আক্রমণ প্রতিহত করার দিকেই বেশি নজর দিয়েছিল। খেলার প্রথমার্ধের লড়াইয়ে কোনও দলই প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতে পারেনি।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের উত্তেজনা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্রাজিল আক্রমণ শানিয়ে গেলেও নরওয়ে হাল ছাড়েনি। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের হাতে চলে গেছে, ঠিক তখনই গর্জে ওঠেন আর্লিং হালান্ড। ম্যাচের ৮০ মিনিটে তাঁর প্রথম গোলটি নরওয়েকে এগিয়ে দেয় এবং দলের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে। এই গোলটি ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত চমৎকারভাবে করেন তিনি।

এরপরই নরওয়ে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। প্রথম গোলের মাত্র ৯ মিনিট পর অর্থাৎ ম্যাচের ৮৯ মিনিটে আবার হালান্ডের ম্যাজিক দেখা যায়। ডি-বক্সের ভিতর দারুণ এক চতুরতায় ব্রাজিলের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন নরওয়েজিয়ান এই গোল মেশিন। এই গোলটিই নরওয়ের ২-১ ব্যবধানে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে।

ব্রাজিলের বিদায় ও বিশ্বকাপের বড় ধাক্কা

হালান্ডের এই জয়সূচক গোলের পর মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার নরওয়েজিয়ান সমর্থক উল্লাসে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে গ্যালারিতে উপস্থিত ব্রাজিলের সমর্থকরা স্তব্ধ হয়ে যান। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল হিসেবে টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছিল ব্রাজিল। তবে শেষ ষোলোর এই ম্যাচেই তাদের বিদায় নিতে হবে, তা হয়তো চরম হতাশাবাদী সমর্থকও কল্পনা করতে পারেননি। নেইমারদের এই অকাল বিদায় লাতিন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে নরওয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা ফুটবল বিশ্বে দীর্ঘকাল আলোচিত হবে। হালান্ড তাঁর ফর্ম বজায় রেখে প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চাপের মুখে তাঁর শান্ত ও ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং নরওয়েকে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

ব্রাজিল দলের জন্য এই পরাজয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের রণকৌশল নিয়ে এখন নানামুখী প্রশ্ন উঠছে। প্রথমার্ধে আধিপত্য বিস্তার করার পরও ম্যাচের শেষ ভাগে এসে ডিফেন্সের এই মারাত্মক ভুলগুলিই তাঁদের হারের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে, এই পরাজয়ের ফলে ব্রাজিলের আরও একটি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন অন্তত আরও চার বছরের জন্য পিছিয়ে গেল।

বিশ্বজুড়ে ফুটবল বিশ্লেষকরা এই ম্যাচটিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে অভিহিত করছেন। বিশেষ করে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের কৌশল পরিবর্তন এবং আক্রমণভাগে হালান্ডের ক্ষিপ্রতা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল। ব্রাজিলের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে রুখে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি-আক্রমণ থেকে গোল বের করার যে কৌশল নরওয়ে সাজিয়েছিল, তা শতভাগ সফল হয়েছে এই ম্যাচে।

নরওয়ের ফুটবলে নতুন দিগন্তের সূচনা

বিশ্বকাপের মঞ্চে নরওয়ের এই পারফরম্যান্স ইউরোপীয় দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে সন্দেহ নেই। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মাধ্যমে তাঁরা দেখিয়ে দিল যে আধুনিক ফুটবলে নামের চেয়ে দলগত সংহতি এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সঠিক প্রয়োগই জয়ের শেষ কথা। আর্লিং হালান্ডের মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড় দলে থাকার সুবিধা নরওয়ে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে দেখিয়ে দিয়েছে কোনও পরিস্থিতিতেই তাঁদের খাটো করে দেখা যাবে না।

নরওয়ের এই স্বপ্নের দৌড় বিশ্বকাপকে আরও বেশি উন্মুক্ত এবং রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। যে কোনও টুর্নামেন্টে ফেভারিট তকমা থাকা দল যে কোনও দিন সাধারণ ভুলের কারণে বিদায় নিতে পারে, এই ম্যাচটি তারই বড় প্রমাণ। হালান্ডের জোড়া গোল শুধু নরওয়েকে পরের রাউন্ডেই নিয়ে যায়নি, বরং বিশ্ব ফুটবলকে জানিয়ে দিল যে তাঁরা বড় দলের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+