অযোধ্যা রাম মন্দিরে দান করা সোনা চুরি! গলিয়ে কি বিস্কুট বানানো হয়েছে? নজরে ট্রাস্টের ৫ বছরের অডিট

অযোধ্যার শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া বহুমূল্য সোনা-দানার অলঙ্কার চুরির তদন্তে এক চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) এখন খতিয়ে দেখছে যে, চুরি হওয়া সোনা-রুপো গলিয়ে বিস্কুট বানিয়ে সেটির আসল পরিচয় মুছে ফেলা হয়েছে কি না। একাধিক তল্লাশি অভিযানেও কোনও অলঙ্কার উদ্ধার না হওয়ায় পুলিশ এই বিষয়ে গভীরভাবে সন্দেহ করছে। মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অমূল্য সম্পদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন উঠছে।

এই মামলার গভীরতা বুঝে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের হিসাব খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের তদন্তকারী দল ট্রাস্টের বিগত পাঁচ বছরের সমস্ত রকম আর্থিক লেনদেন ও মূল্যবান উপহার পাওয়ার খতিয়ান নতুন করে অডিট করবে। এই বিশেষ পাঁচ বছরের রি-অডিটের আওতায় মন্দিরের নির্মাণ কাজ সংক্রান্ত বিপুল খরচ এবং সোনা, রুপো ও দান করা সামগ্রীর প্রকৃত হিসাব পুনরায় মিলিয়ে দেখা হবে।

Police officials investigating the Ayodhya Ram Temple donation theft case

তদন্তের অগ্রগতির অংশ হিসেবে এসআইটি-র আধিকারিকরা সম্প্রতি রাম মন্দির প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে প্রথমে রাম লালার পুজা দেন। এরপর তাঁরা মন্দিরের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কেডি বাবুর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। ভক্তদের দেওয়া নানা অলঙ্কার ও রুপোর বড় সামগ্রী কীভাবে নথিভুক্ত করা হয়, কোথায় মজুত রাখা হয় এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে চলে, সেই বিষয়ে তাঁকে বিষদ জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিশ আধিকারিকরা।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভক্তদের দান করা মূল্যবান সোনা ও রুপো সঠিক পদ্ধতিতে গলানোর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান 'মিন্ট’ বা ট্যাঁকশালের সাহায্য নেওয়া হতো। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে প্রথম দফায় ৯.৪৪ কুইন্টাল (৯৪৪ কেজি) রুপো মান পরীক্ষার জন্য ওই ট্যাঁকশালে পাঠানো হয়েছিল। তদন্তকারীরা এখন ট্যাঁকশালের সঙ্গে হওয়া সমস্ত লেনদেনের রসিদ এবং ব্যাঙ্কের যাবতীয় নথিপত্রের সঙ্গে ট্রাস্টের খাতার হিসাব নতুন করে মিলিয়ে দেখছেন।

ট্রাস্টের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই অতীতে প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন যে, রাম মন্দির তহবিলে দান হিসেবে প্রায় ১৩ কুইন্টাল রুপো এবং ২০ কেজি সোনা জমা পড়েছে। তবে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে যে, ট্রাস্টের নিয়মিত ত্রৈমাসিক বৈঠকে নগদ আয়ের হিসাব খোঁজা হলেও, সংগৃহীত সোনা-রুপোর মজুত খতিয়ান বা তার সঠিক মূল্যায়ন নিয়ে ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ কোনো নিয়মিত নজরদারি বা সুনির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা ছিল না।

হিসাব ও নজরদারির এই গুরুতর গরমিলের সুযোগ নিয়েই অভিযুক্তদের পক্ষে এমন জালিয়াতি করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন আধিকারিকরা। এসআইটি এখন এই চুরির ঘটনার সূত্র ধরে কেবল টাকশালের নথিপত্রই মেলাচ্ছে না, বরং ওই মূল্যবান সামগ্রী ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিও পুঙ্খানুপুঙ্খ স্ক্যান করছে। ট্রাস্টের কর্তারা যেভাবে বিপুল মূল্যের এই সম্পত্তির তদারকি করেছেন, তাতে গাফিলতির স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে।

গ্রেফতারের জাল ও ট্রাস্ট কর্তাদের পদত্যাগ

মন্দিরের দান বা সম্পত্তি আত্মসাতের এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি গত ৭ জুন প্রথম সাধারণের সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ায় উত্তরপ্রদেশ সরকার অবিলম্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করে। প্রাথমিক তদন্তে অসঙ্গতি পাওয়ার পর ২৫ জুন একটি এফআইআর রুজু করা হয় এবং এখনও পর্যন্ত এই চুরির অভিযোগে আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ধৃতরা সকলেই রাম মন্দিরের দানবাক্স খোলা এবং সেই টাকার হিসাব ও গণনার কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত অবিনাশ শুক্লাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জেরা করে বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে। পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অঙ্কের নগদ টাকা এবং অবৈধ লেনদেনের হদিশ এই অবিনাশের কাছ থেকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

তদন্তের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে জিজ্ঞাসাবাদের জালে পড়তে হয়েছে ট্রাস্টের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই, প্রাক্তন ট্রাস্টি অনিল মিশ্র এবং মন্দির আধিকারিক গোপাল রাওকে। তীব্র বিতর্কের মাঝে চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্র ইতিমধ্যেই নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আগামী ৬ জুলাই ট্রাস্টের একটি বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে তাঁদের জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও আরএসএসের কড়া বার্তা

রাম মন্দিরের মতো ভারত তথা বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের আবেগের সাথে জড়িত একটি পবিত্র স্থানে এই ধরনের জালিয়াতি খুব দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের আকার নিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। একই সাথে ট্রাস্ট গঠনের আগের সমস্ত দানের টাকার হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিও তুলেছে তারা।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) বিষয়টিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, রাম মন্দিরে ভক্তদের দানের টাকা ও গয়না নিয়ে চুরির এই ন্যক্কারজনক ঘটনা দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তারা এই অপকর্মের সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম আইনি শাস্তির দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও এসআইটি বর্তমানে তদন্তের প্রতিটি ছোট রিপোর্ট খতিয়ে দেখছে এবং বাকি পলাতকদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে। এই বিরাট সোনা চুরির পিছনে অন্য কোনো প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে কি না এবং অলঙ্কার গলানোর কাজে কোনো স্যাকরা বা জুয়েলারি ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করছে প্রশাসন। আগামী দিনে এই মামলার অডিট রিপোর্ট থেকে আরও অনেক অপ্রিয় তথ্য সামনে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+