ফের কালীঘাট তৃণমূলের অন্দরে কোন্দল চরমে! মমতার হাত ছাড়লেন ছায়াসঙ্গী চন্দ্রিমা

কালীঘাট তৃণমূলে আবারও বিদায়ের সুর। তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিলেন প্রবীণ নেত্রী তথা ভোটের পর রাজ্য সভানেত্রীর পদ পাওয়া চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। নেত্রীর এই নাটকীয় ইস্তফা এবং তার ঠিক পরেই বিধানসভায় বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে বৈঠক ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিমার এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত শুধু দলকে বড় ধাক্কা দেয়নি, বরং 'কালীঘাট’ ও 'নব তৃণমূল’ শিবিরের ক্ষমতার লড়াইকে এক অন্য মাত্রা দিয়ে গেল।

শনিবার দুপুরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে দলের সাধারণ সদস্যপদ ছাড়া বাকি সব সাংগঠনিক দায়িত্ব ত্যাগ করেন চন্দ্রিমা। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সিগনেটরি দায়িত্ব থেকেও তিনি অব্যাহতি নেন। চন্দ্রিমার এই ইস্তফা মূলত নিজের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও অভিমানের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এর ফলে মমতাপন্থী শিবির রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল।

Chandrima Bhattacharya announces resignation from TMC party posts

অভিমানের নেপথ্যে মেট্রোপলিটন ভবনের বিতর্ক

হঠাৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন দীর্ঘদিনের এই বর্ষীয়ান নেত্রী? ইস্তফা দেওয়ার পর নিজেই সেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তাঁর ক্ষোভের মূলে রয়েছে শুক্রবারের একটি ঘটনা, যা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে বেশ কিছুদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। মেট্রোপলিটন এলাকার দলীয় ভবন দখলকে কেন্দ্র করে 'কালীঘাট তৃণমূল’ এবং 'ঋতব্রত তৃণমূল’—এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। চন্দ্রিমার দাবি, এই ঘটনার সমাধান করতেই তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

চন্দ্রিমা জানান, শুক্রবার যখন মেট্রোপলিটন ভবনে বিদ্রোহী শিবিরের কয়েকজন বিধায়ক আসেন, তখন তিনি সেখানে থাকলেও তাঁরা তাঁর সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। পরবর্তীতে তিনি বাড়ি ফিরে আসার পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ফোন করতে বলেন। চন্দ্রিমা ফোন করতেই মমতা প্রশ্ন তোলেন, "তুমি ওদের হাতে ভবন তুলে দিলে?" এই একটি প্রশ্নই চন্দ্রিমার বহু বছরের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক জীবনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

বেদনার সুরে বিদায়ী সভানেত্রী বলেন, "দিদি আমাকে এই কথা বলতে পারলেন? আমার আনুগত্যে কোনও খামতি নেই। যখন আমার সততা ও অনুগত মানসিকতার ওপরই প্রশ্নচিহ্ন এসে দাঁড়িয়েছে, তখন আর আমার কাজ করা উচিত নয়।" চন্দ্রিমা সাফ জানিয়ে দেন, যে কালীঘাটের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল, সেখানে আর ফিরে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

বিধানসভায় বিদ্রোহী শিবিরের অভ্যর্থনা ও বৈঠক

দলীয় পদ ছাড়ার ঠিক পরেই দুপুরে সরাসরি বিধানসভায় পৌঁছে যান চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সেখানে তাঁর আগমনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। বিধানসভার প্রবেশদ্বারে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সন্দীপন-সহ তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়করা। চন্দ্রিমার মতো প্রবীণ রাজনীতিককে তাঁরা 'সিনিয়র নেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সক্ষমে দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।

এরপরই চন্দ্রিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে। সেখানে 'নব তৃণমূল’ বা বিদ্রোহী শিবিরের একাধিক বিধায়কের উপস্থিতিতে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে বৈঠকের এই ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, চন্দ্রিমার মতো হেভিওয়েট নেত্রীর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহী শিবির মমতাপন্থীদের ওপরে আরও বেশি চাপ তৈরি করতে চাইছে।

বৈঠক শেষে চন্দ্রিমার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনও সরাসরি উত্তর দেননি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর পরবর্তী অবস্থান প্রসঙ্গে গম্ভীর মুখে তিনি কেবল মন্তব্য করেন, "কালের যাত্রায় সবাইকে পা মেলাতেই হয়।" তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে নানা জল্পনা ও গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করেছে। তবে কি তিনি খুব শীঘ্রই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে চন্দ্রিমা পরে দাবি করেন, বিধানসভার কাজ সংক্রান্ত কিছু নথি জমা দিতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

কালীঘাট শিবিরের তীব্র আক্রমণ

চন্দ্রিমার এই আকস্মিক পদত্যাগ এবং বিরোধী দলনেতার ঘরে তড়িঘড়ি বৈঠক করাকে একেবারেই ভালভাবে নেয়নি কালীঘাটপন্থী তৃণমূল শিবির। চন্দ্রিমার এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন মমতাপন্থী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ কুণাল ঘোষ। তিনি ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও দলীয় ক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে চন্দ্রিমাকে তীব্র আক্রমণ করেন। কুণালের এই মন্তব্য দলের অভ্যন্তরে যে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট করে দেয়।

কুণাল ঘোষ বলেন, "কেউ যদি মনে করেন তিনি বিশ্বাসঘাতক শিবিরে নাম লেখাবেন, তবে তাতে আমাদের কিছু বলার নেই। এদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও যোগাযোগ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন চন্দ্রিমা সবচেয়ে বেশি দফতরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তখন ওঁর কোনও অভিমান বা ক্ষোভ হয়নি? ক্ষমতা উপভোগ করার পর আজ পদ ছাড়ার রহস্যটা কী?"

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+