বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বাধা? মমতার 'হাউস অ্যারেস্ট' অভিযোগে তুঙ্গে বিতর্ক!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক কিশোরীর নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে যুদ্ধংদেহী পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। এই আবহে কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর এক অভিযোগ আনা হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কালীঘাট তৃণমূল সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর কালীঘাটের বাসভবনেই কার্যত গৃহবন্দি করে রেখেছে পুলিশ প্রশাসন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারুইপুরের ওই নির্যাতিতা নাবালিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। কালীঘাট তৃণমূলের অভিযোগ, এই সফরের কথা জানতে পেরেই সক্রিয় হয়ে ওঠে রাজ্যের বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। তড়িঘড়ি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির বাইরে এবং আশপাশের রাস্তায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। লোহা এবং কাঠের ব্যারিকেড দিয়ে পথ অবরুদ্ধ করা হয় যাতে তিনি বারুইপুরের উদ্দেশে বেরোতে না পারেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারি হ্যান্ডেল থেকে করা একটি পোস্টে ক্ষোভের সঙ্গে লেখা হয়েছে, “আমাদের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের খোঁজ নিতে এবং তাদের সান্ত্বনা দিতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই সফরের খবর জানাজানি হতেই তাঁর বাসভবনের বাইরে ব্যারিকেড তৈরি করে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।” এই পদক্ষেপকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে দল সাফ জানিয়েছে যে, কোনো বাঁধাই তাদের ন্যায়ের লড়াই থেকে পিছু হটাতে পারবে না। বারুইপুরের ঘটনার সুবিচারের দাবিতে তারা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে।

বারুইপুরের কিশোরী নিখোঁজ রহস্য ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

এই ভয়ানক রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর মহকুমার সূর্যপুর এলাকার একটি মর্মান্তিক অপরাধ। গত শনিবার বিকেলে বছর বারোর এক নাবালিকা তার বান্ধবীর জন্য জন্মদিনের একটি উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পরও সে বাড়ি ফিরে না আসায় তার পরিবারের মানুষজন উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। অভিযোগ, স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করা হলেও পুলিশ প্রথম দিকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি এবং কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

পুলিশের প্রাথমিক অলস প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে নাবালিকার পরিজন এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা নিজেরাই সারা রাত ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি শুরু করেন। পরিবারের দাবি, ৪ জন যুবক জোর করে মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর রবিবার সকালে এলাকা জুড়ে ক্ষোভ বারুদের রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিজেদের উদ্যোগে চিহ্নিত করে গ্রাস করেন। ক্ষুব্ধ জনতার কঠোর জেরার মুখে ওই ব্যক্তি অবশেষে স্বীকার করে যে নাবালিকাকে হত্যার পর তার দেহ কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

সেই তথ্যের সূত্র ধরে স্থানীয় সূর্যপুর হাট এলাকার একটি পুকুরের পাশ থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় ওই নাবালিকার রক্তাক্ত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। বস্তা খুলতেই নাবালিকার মৃত্যুর ভয়াবহ রূপ দেখে এলাকায় কান্নার রোল ও উত্তেজনা আকাশ ছোঁয়। উন্মত্ত জনতা আটক হওয়া ওই প্রধান অভিযুক্তের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে গণপিটুনি দিতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে গুরুতর জখম অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

রাজনৈতিক চাপানউতোর ও পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল

অভিযুক্তের মৃত্যুর পর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঘটনার স্পর্শকাতরতা বিচার করে পুরো বারুইপুর জুড়ে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে যে সে বিজেপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে রাজ্য পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, তৃণমূল নেত্রী ব্যক্তিগতভাবে সেখানে গিয়ে নির্যাতিতার মায়ের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপি চালিত প্রশাসন যেভাবে পুলিশকে দিয়ে তাঁর গতিবিধি অবরুদ্ধ করেছে, তা চরম স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনার মাধ্যমে সরকার বিরোধীদের মুখ ও নৈতিক কণ্ঠরোধ করতে চাইছে বলে তৃণমূলের দাবি। অন্যদিকে, পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে, এলাকার বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও শান্তি বজায় রাখতেই এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই মুহূর্তের ছবি অত্যন্ত জটিল। একদিকে এক নাবালিকার নৃশংস পরিণতি এবং উদ্ধারকার্যে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ, অন্যদিকে জনতার আদালতে অভিযুক্তের মৃত্যু এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রীর পথ আটকানোর চেষ্টা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এক অভূতপূর্ব সংকটের দিকে মোড় নিয়েছে। রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে এবং দ্রুত প্রকৃত সত্য সামনে আনার দাবি উঠছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টালবাহানা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট সংশয় তৈরি করেছে। একদিকে যেমন বারুইপুরের নির্যাতিতার পরিবারের যন্ত্রণার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক চাহিদার বিষয় রয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তা খেই হারাচ্ছে। প্রশাসনের উচিত হবে কোনো দলগত পক্ষপাতহীনভাবে দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে দোষীদের শাস্তির পথ প্রশস্ত করা যাতে দ্রুত শান্তি ফিরে আসে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+