আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের খবরে বড় ধস ভারতীয় শেয়ার বাজারে, কী করবেন লগ্নিকারীরা?
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের দামামা নতুন করে বেজে উঠতেই বুধবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে মারাত্মক ধস নামল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তি বাতিল বলে ঘোষণা করার পরই আন্তর্জাতিক বাজারে এক তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়েছে ভারতের শেয়ার বাজারে, যার ফলে এদিন সূচক অনেক নিচে নেমে গিয়েছে।
এদিন দুপুরের লেনদেনে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সেনসেক্স প্রায় ১৮০০ পয়েন্ট বা প্রায় ২.১ শতাংশ পড়ে গিয়ে ৭৬,৫৭০.৪৭ পয়েন্টের স্তরে নেমে আসে। একই সঙ্গে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের মানদণ্ড সূচক নিফটি ৫০ প্রায় ২.০৩ শতাংশ বা ব্যাপক দর হারিয়ে ২৩,৯০২.৬৪ পয়েন্টে এসে ঠেকে। গত দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে শতাংশের নিরিখে এটিই ভারতীয় শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বড় পতন।

ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার ইঙ্গিত ও বিশ্ব বাজারে আতঙ্কের হাওয়া
তুরস্কে আয়োজিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখার ভঙ্গুর চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। ট্রাম্প বলেন, "যেটুকু আমি বুঝতে পারছি, এই সমঝোতা এখন পুরোপুরি শেষ। ওদের সাথে আলোচনা বা চুক্তি বজায় রাখার চেষ্টা করা স্রেফ সময়ের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।"
তিনি আরও জানান যে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা চাইলে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনও ইতিবাচক ফল দেখছেন না। ট্রাম্পের এমন ধোঁয়াশাহীন অনমনীয় অবস্থান এবং ইরানের কূটনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তাঁর তীব্র অনীহা স্পষ্ট হতেই বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। ফলস্বরূপ, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার অন্যান্য বড় স্টক এক্সচেঞ্জগুলিতে ব্যাপক পতনের আবহ তৈরি হয়।
এই সংঘাত কেবল আশঙ্কার স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাঠপর্যায়ে সামরিক পদক্ষেপ শুরু হয়ে গিয়েছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের একাধিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার স্টেশন এবং রেভোলিউশনারি গার্ডসের অন্তত ৬০টি ছোট নৌযানসহ মোট ৮০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁত আঘাত হেনেছে।
আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ যাতায়াত সুনিশ্চিত করতেই তারা এই সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই হামলার পরই ইরান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ইরানি রেভোলিউশনারি গার্ডস তাৎক্ষণিকভাবে কুয়েত এবং বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালায়। এই সরাসরি সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও শক্তির সংকট নিয়ে আশঙ্কা
সমগ্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগত প্রতিরক্ষামূলক জলপথ হরমুজ প্রণালী। এটি ব্যাপক ব্যস্ত এবং সংবেদনশীল বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহণ রুট হিসেবে পরিচিত। ইরান অনেক দিন ধরেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। তেহরানের সাফ কথা, তাদের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে পারবে না এবং নির্দিষ্ট শুল্ক দিতে হবে।
ইতিপূর্বে ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-ইজরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ইরানের তুমুল বিরোধ শুরু হওয়ার পর এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়ে পড়েছিল। তবে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি আপৎকালীন শান্তি চুক্তির কারণে আংশিকভাবে বাণিজ্যিক ট্রাফিক স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু ওমান ও ইরানের সীমান্ত ঘেরা এই প্রণালীটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আলোচনা শুরুর আগেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।
চুক্তি ভেঙে নতুন করে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের জেরে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যেকোনও সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে তেলের ঘাটতি তৈরি করবে। এই আশঙ্কায় বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তরতর করে বাড়তে শুরু করেছে, যার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি ভারতের বাজারেও পড়ছে।
দালাল স্ট্রিটে রক্তক্ষরণ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ
ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের সিংহভাগই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি বাড়লে এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে ভারতীয় অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির পারদ আরও চড়বে। এই আশঙ্কার জেরে বুধবার ভারতীয় পুঁজিবাজারে লগ্নিকারীরা ঝুঁকি এড়াতে ধুমধাম শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। তথ্যপ্রযুক্তি, তেল ও গ্যাস, এবং ব্যাঙ্কিং সেক্টরের শেয়ারগুলিতে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় লক্ষ্য করা গিয়েছে।
বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII) এদিন ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রত্যাহারের দিকে ঝুঁকেছেন। যার সরাসরি ফল হিসেবে লেনদেন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতীয় সূচক হুড়মুড় করে নিচের দিকে নামতে থাকে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের চলাচল স্বাভাবিক ও সুরক্ষিত হচ্ছে, ততক্ষণ ভারতীয় বাজারে এমন সংশোধন বা চাপ অব্যাহত থাকবে।
এমন চরম অনিশ্চিত বাজার পরিস্থিতি খুচরো বিনিয়োগকারীদের অত্যন্ত ধৈর্য ও সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই মুহূর্তে কোনো হুজুগে বা আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে ভালো শেয়ারগুলি লোকসানে বিক্রি করে দেওয়া যেমন ক্ষতিকারক হতে পারে, তেমনই অতিরিক্ত মুনাফার লোভে হঠাৎ নতুন করে কোনও ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেডিং না করাই শ্রেয়। মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ এবং বিশ্ব কূটনৈতিক মহলের ওপরই আগামী দিনের বাজার নির্ভর করছে।












Click it and Unblock the Notifications