ট্রাম্পের ঘোষণায় ভাঙল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে ফের অশনিসঙ্কেত

পশ্চিম এশিয়ায় চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাকে চুরমার করে ইরানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'যুদ্ধবিরতি চুক্তি’ বাতিল ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক বা মউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা আর কার্যকর নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই চরম ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইরানি সামরিক বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

মার্কিন বিমান হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম এক ধাক্কায় তিন শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালীতে একাধিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার জবাবে আমেরিকা এই বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা জবাবে ইরানও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে রকেট ও মিসাইল বর্ষণ শুরু করেছে, যার ফলে গত কয়েক মাসে গড়ে ওঠা সামগ্রিক কূটনৈতিক শান্তি প্রক্রিয়া ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

US fighter jets launching missiles in Middle East

সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় চলমান ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, "আমার কাছে ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি এই একগুঁয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আর কোনও কূটনৈতিক আলোচনা করতে বা কোনও সম্পর্কে জড়াতে প্রস্তুত নই।"

যদিও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দুই দেশের প্রতিনিধি দল হয়তো অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে পারে, তবে ট্রাম্প ওই প্রক্রিয়াকে চরম সময়ের অপচয় বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন যে, যা বারবার বিশ্ববাসীর কাছে অসত্য কথা বলে বিশ্ব শান্তি বিঘ্নিত করছে, তাদের সঙ্গে কোনও ইতিবাচক আলোচনা সম্ভব নয়। হোয়াইট হাউসের এই কড়া অবস্থানের ফলে গত মাসে শুরু হওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্পূর্ণ বন্ধ হতে চলেছে বলে আবহ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে ইরান আসলে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল বা প্রায় ২০ শতাংশ খনিজ সম্পদ আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয় যে অতি সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে, সেই হরমুজ প্রণালীর দখল ধরে রাখতে তেহরান মরিয়া। এই রমরমা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত তিন সপ্তাহের ঠুনকো যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল বলে মনে করা হচ্ছে।

তীব্র মার্কিন বিমান হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ

মঙ্গলবার রাত থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান ও যুদ্ধজাহাজগুলো ইরান জুড়ে ভয়াবহ মাত্রায় মুহুর্মুহু হামলা চালাতে শুরু করে। মার্কিন সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন বাহিনী ইরানের বন্দর আব্বাস, সিরিক এবং কেশম দ্বীপের আশপাশে অবস্থিত বিপুল পরিমাণ কৌশলগত স্থানে বোমাবর্ষণ করেছে। সব মিলিয়ে প্রায় আশিটির বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইরানি সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, রেডার সেন্টার এবং বন্দর অঞ্চল বিমান হানায় তছনছ হয়ে গিয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের প্রাক্তন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের প্রয়াণ উপলক্ষে সে দেশে যখন রাষ্ট্রীয় শোক ও শেষকৃত্যের সাত দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা চলছিল, ঠিক সেই সময়ই আমেরিকা এই মারাত্মক হামলা চালাল। খামেনেই এই বছরের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলি যৌথ বাহিনীর পরিচালিত এক অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণ শোকের মধ্যেই তেহরানকে এই দ্বিতীয় চরম ধাক্কার মুখোমুখি হতে হল।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন দাবি করেছে যে, মঙ্গলবার দুপুরে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিতর্কিত জলসীমায় তিনটি সাধারণ মালবাহী জাহাজের ওপর যে চোরা হামলা চালানো হয়েছিল, তার উপযুক্ত শাস্তি দিতেই ওয়াশিংটন এই কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। আক্রান্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মধ্যে 'আল-রেকাইয়াত’ নামের একটি অন্যতম পণ্যবাহী ট্যাঙ্কার ওমানের জলসীমা হয়ে সরাসরি ভারতের দিকে আসছিল। হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসার সময় এই ভারতগামী জাহাজটিকেও আক্রান্ত হতে হয়েছিল বলে পেন্টাগন দাবি করেছে।

এদিকে মার্কিন আক্রমণের অব্যবহিত পরই প্রত্যাঘাত হেনেছে তেহরানও। ইরানের দুর্ধর্ষ নিরাপত্তা বাহিনী 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী 'ফিফথ ফ্লিট’ এবং কুয়েতের একাধিক যৌথ সেনা ছাউনি লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানি সামরিক কমান্ড দাবি করেছে, অভিযান চলাকালীন তারা আমেরিকার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল শিকারি আকাশযান 'এমকিউ-৯ ড্রোন’ গুলি করে নামাতে সক্ষম হয়েছে, তবে ওয়াশিংটন সরকারিভাবে ড্রোন ধ্বংসের বিষয় নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে।

ভারতীয় অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এর সামগ্রিক ক্ষতিকর প্রভাব

ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলার ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা। ভারত তার মোট প্রয়োজনীয় তেল চাহিদার প্রায় আশি শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার একটি সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্যের এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই ভারতে আসে। ভারতগামী কোনও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য গভীর অশনি সংকেত বলে মনে করছেন ভারতের শীর্ষ ব্যবসা বিশ্লেষকরা।

ইরান অবশ্য ওয়াশিংটনের আনা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করেছে এবং তাদের জলসীমায় ভারতের দিকে কোনো জাহাজকে টার্গেট করার খবরকে মার্কিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তেহরানের সাফ দাবি, কেবল তাদের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত এবং সুরক্ষিত রুটগুলি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক জাহাজের বাহ্যিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব নয়। ইরানের ওপর আমেরিকার পুনঃনিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে পুরো এশিয়ার সরবরাহ শৃঙ্খলে এক নতুন গভীর সঙ্কটের কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই আকস্মিক ধ্বংসাত্মক ঘটনাপ্রবাহ সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্র নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার ঠিক পরপরই আন্তর্জাতিক তেলের বাজার অস্থির হওয়া শুরু করেছে, যা কোনো একক রাষ্ট্র নয় বরং সমকালীন বিশ্বের প্রতিটি দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে মারাত্মকভাবে উস্কে দিতে পারে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি নতুন কোনো আপোসে পৌঁছতে পারে কি না, সেদিকেই নজর রাখছে নয়াদিল্লি সহ সারা বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+