বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন! পুলিশের জালে আরও এক অভিযুক্ত

বারুইপুরে ১২ বছরের নাবালিকাকে নৃশংস নির্যাতন ও খুন করার ঘটনায় তদন্তের জাল ক্রমাগত গুটিয়ে আনছে পুলিশ। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে বারুইপুর থানার স্পেশাল অপারেশন টিম ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। এই নিয়ে মূল ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হল। তদন্তকারী অফিসারদের দাবি, ধৃতদের জেরা করে ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে।

মঙ্গলবার রাতে গোপন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে রাজ্য পুলিশের বিশেষ দল হুগলি ও সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চতুর্থ অভিযুক্তকে জালে তুলতে সমর্থ হয়। তদন্তকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধৃত ব্যক্তির নাম কবীর মোল্লা। তাকে বারুইপুর থানায় এনে তৈরি হওয়া বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের (SIT) গোয়েন্দারা জেরা শুরু করেছেন। এই ঘটনার দিন সে কীভাবে যুক্ত ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Police conducting investigations at Baruipur crime scene

পুলিশি এনকাউন্টারে অন্যতম অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু

বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনার তদন্ত চলাকালীন আচমকাই এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তদন্তের স্বার্থে ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের খোঁজে পুলিশ যখন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়, তখন সেখানে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তদন্তকারী দল জানিয়েছে, ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ অপরাধস্থলের পুনর্গঠন করার সময়ই পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় প্রভাস মণ্ডলের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গভীর রাতে আনুমানিক পৌনে একটা নাগাদ সূর্যপুরের অপরাধের ঘটনাস্থলে প্রভাসকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন আচমকাই প্রভাস এক পুলিশকর্মীর কাছ থেকে তার সার্ভিস রিভলভার কেড়ে নিয়ে গুলি চালায়। এরপর সে পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

এনকাউন্টারের খবরটি প্রকাশ পেতেই এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং সরকারি অস্ত্র উদ্ধারের জন্য গুলি চালানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। তবে এই ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলি এবং বিরোধী দলগুলির তরফ থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা শুরু হয়েছে। সামগ্রিক বিষয়টির ওপর কড়া নজর রাখছে নবান্ন।

দশ হাজার টাকার চুক্তি ও নাবালিকার ওপর কড়া নজরদারি

তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই জঘন্য অপরাধটি কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত ছিল। পুলিশি জেরায় উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে, বারুইপুরের ওই নাবালিকার ওপর গত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে অনবরত কড়া নজর রাখছিল আনন্দ সর্দার নামের এক অভিযুক্ত। সে-ই মূলত টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাকিদের এই অপরাধে যুক্ত করেছিল।

তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে, নাবালিকাকে ভুল বুঝিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে ফুসলিয়ে নিয়ে আসার জন্য প্রভাস মণ্ডলকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আনন্দ সর্দার। মূলত এই সামান্য টাকার লোভেই প্রভাস ওই পেতে থাকা ফাঁদে নাবালিকাকে পা দিতে বাধ্য করে। আনন্দের নির্দেশ মতোই সে সুযোগ বুঝে নাবালিকাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এই সমস্ত বিস্ফোরক তথ্য স্বীকার করা হয়েছে।

উত্তেজনা প্রশমনে কড়া পুলিশি পদক্ষেপ ও গণগ্রেফতার

নাবালিকার ওপর এই অমানুষিক অত্যাচার ও মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় গোটা বারুইপুর এলাকা। অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। এই বিক্ষোভ পরবর্তীতে চরম হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে, যার ফলে এলাকায় বড়সড় ভাঙচুর, পথ অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম তৈরি হয়েছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বারুইপুর জেলা পুলিশ কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভাঙচুর ও অশান্তি ছড়ানোর দায়ে তল্লাশি চালিয়ে ইতিমধ্যেই ২০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আবেগের বশবর্তী হয়ে বা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। পুরো এলাকায় বর্তমানে বিশাল পুলিশ বাহিনী টহল দিচ্ছে।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে নারী নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে শাসকদলকে কড়া তোপ দাগা হয়েছে। একইসঙ্গে পুলিশের ভূমিকার নিরপেক্ষতা নিয়েও সরব হয়েছেন নেটিজেন ও রাজনীতিকেরা। অন্যদিকে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে যে, কোনও অপরাধীকেই রেহাই দেওয়া হবে না এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

আপাতত বারুইপুরের সার্বিক পরিস্থিতি থমথমে হলেও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চার অভিযুক্তের গ্রেফতারি এবং পুলিশের লাগাতার অভিযানে স্থানীয় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও নাবালিকার পরিবারের শোক যেন কিছুতেই কাটছে না। মৃত নাবালিকার নির্মম পরিণতির দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছেন এলাকার প্রতিটি মানুষ। সিটের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, এই মামলার সমস্ত অকাট্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে অপরাধীদের চরম শাস্তির ব্যবস্থা করাই এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+