ওমান উপসাগরে কাতারের এলএনজি ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ ড্রোন হামলা, অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলেন চার ভারতীয় নাবিক
বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর সমুদ্রপথ ওমান উপসাগরে কাতার থেকে ভারতগামী একটি বিশাল এলএনজি পরিবহণকারী জাহাজে আকস্মিক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনায় ভারতের কূটনৈতিক ও সামুদ্রিক মহলে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই চরম উৎকণ্ঠার মাঝেই স্বস্তির বিষয় হল, আক্রান্ত জাহাজটিতে থাকা চারজন ভারতীয় নাবিকই সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছেন এবং তাদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
হামলার শিকার হওয়া এই কাতারি জাহাজটির মালিকানা ও পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারতের সামুদ্রিক প্রশাসন। জাহাজটির নাম 'এলএনজিসি আল-রেকায়াত'। ঘটনার খবর নিশ্চিত হওয়া মাত্রই ভারতের নৌ-বাণিজ্য বিষয়ক সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব শিপিংয়ের (ডিজিকম) পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানতে আরপিএসএল-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ড্রোনের আঘাতে জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগে প্রচুর কালো ধোঁয়া বের হলেও বড় বিপর্যয় এড়ানো গিয়েছে।

হামলার কবলে 'আল-রেকায়াত' এবং ভারতের সংযোগ
কাতার পেট্রোলিয়ামের এই বিশাল এলএনজি ট্যাংকারটি কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে তরল গ্যাস বোঝাই করে ভারতের গুজরাট রাজ্যের দহেজ এলএনজি টার্মিনালের দিকে রওনা দিয়েছিল। জাহাজটিতে ওই মুহূর্তে বিভিন্ন দেশের মোট ২৯ জন পেশাদার ক্রু মেম্বার কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে চারজন ভারতীয় নাবিকের উপস্থিতি ভারতের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বিষয়ক নৌ-নিরাপত্তা মহলকে স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সতর্ক করে তোলে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
ইঞ্জিন রুমে আগুন লাগার ফলে জাহাজটির গতি সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও ক্রুদের সাহসিকতা ও পেশাদার লড়াইয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা রুখে দেওয়া গেছে। এই ধরনের এলএনজি ট্যাঙ্কারগুলি সাধারণত উচ্চমাত্রার দাহ্য গ্যাস বহন করে, ফলে রকেট বা ড্রোন স্ট্রাইক থেকে অতি সহজে প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। তবে জাহাজের স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার তৎপরতায় জ্বালানি মজুত সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।
কাতার ও ইরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
এই রহস্যজনক এবং আক্রমণাত্মক ঘটনার পরই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ কাতার এই কাপুরুষোচিত নাশকতার পিছনে সরাসরি প্রতিবেশী দেশ ইরানের দিকে আঙুল তুলেছে। দোহার বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে ইরানের এই সশস্ত্র হামলাকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের খোলাখুলি লঙ্ঘন এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অবাধ যাতায়াত অধিকার খর্ব করার অশুভ চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কাতারের সরকারি মুখপাত্র ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন যে, কোনও দেশই যাতে নিজেদের সংকীর্ণ ও একতরফা স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে বিশ্ব বাণিজ্য ও সাধারণ নাবিকদের জীবন হুমকির মুখে না ফেলে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী সমস্ত বৈশ্বিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত। দোহার দাবি, এই হামলার কারণে ঘটে যাওয়া জাহাজটির বিপুল ক্ষয়ক্ষতি এবং ভবিষ্যতের সমস্ত আশঙ্কাজনক পরিণতির সম্পূর্ণ আইনি ও আর্থিক দায়ভার একমাত্র ইরানকেই নিতে হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য ও হরমুজ প্রণালীর ভূ-রাজনীতি
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালীকে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে গণ্য করা হয়। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ প্রতিদিন এই সরু প্রণালীর অতি সংকীর্ণ চ্যানেল অতিক্রম করে ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলিতে পৌঁছয়। তাই এই সংবেদনশীল জলসীমায় হামলার অর্থ দাঁড়িয়েছে সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান লাইফলাইনটিকে এক প্রকার অচল করে ফেলার চেষ্টা।
বিগত কয়েক বছর ধরেই এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজ ও অয়েল ট্যাঙ্কারের ওপর রহস্যজনক হামলা চালুর একটি ট্রেন্ড তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টতই একে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর ও প্রভাবশালী দেশগুলির মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী ছদ্মযুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ মনে করছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই নোংরা ছদ্মযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বলি হতে হচ্ছে বিশ্বজুড়ে সাধারণ সামুদ্রিক নাবিকদের ও নিরাপদ যাত্রী পরিষেবাকে।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নৌবাহিনীর ভূমিকা
ভারতের কাছে এই সংঘাতের মাত্রা ও ভয়াবহতা অত্যন্ত গুরুতর এবং উদ্বেগজনক। ভারত তার জাতীয় শক্তির উৎস তথা গ্যাসের বিপুল চাহিদার সিংহভাগ আমদানির জন্য প্রাকৃতিক জ্বালানি সমৃদ্ধ কাতারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গুজরাটের দহেজে অবস্থিত আমাদের রি-গ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্টটি ভারতের শিল্প ও পরিকাঠামো খাতের রক্তসঞ্চালন স্বরূপ। ফলে কাতারি ট্যাংকারের ওপর এমন ন্যাক্কারজনক আঘাত দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস বাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে আঘাত হানতে পারে।
ড্রোনের মাধ্যমে বা জলদস্যুদের দ্বারা মাঝসমুদ্রে হামলা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের নৌসেনার একাধিক অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ার ও নজরদারি বিমান আরব সাগর এবং এডেন উপসাগরের বুকে দিনরাত পাহারাদারি চালাচ্ছে। দেশের বাণিজ্যিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথে সাধারণ জীবনযাত্রা সচল রাখতে ভারতীয় নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী যৌথভাবে গুজরাটের দহেজ, কান্ডালা ইত্যাদি সংবেদীনশীল বন্দরগুলির বহিস্থ নিরাপত্তা বহর অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও নাবিক সুরক্ষা
আন্তর্জাতিক জলসীমায় সমুদ্রবাণিজ্য স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ অবাধ রাখতে হলে অতি দ্রুত বিশ্বের তাবড় ক্ষমতাধর জোটগুলিকে একত্রিত হয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমুদ্রে ড্রোন প্রতিরোধী বিশেষ সামরিক ছাতা গড়ে তোলা বা উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপত্তা বাড়ানোকে এখন রাষ্ট্রসংঘের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা উচিত। এর অন্যথা হলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণের খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম অত্যাধিক বেড়ে যাবে, যা শেষপর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে বাজারের আগুন ও সাধারণের সমস্যা বাড়াবে।
নাবিকদের জীবনের সুরক্ষাকে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা মহাদেশীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বে হাতিয়ার করা জঘন্যতম অপরাধের সমতুল্য। যেকোনও আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাধারণ নাবিকের অবাধ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গ। আক্রান্ত ট্যাঙ্কারের ভারতীয় নাবিকদের অলৌকিক কিন্তু চরম নিরাপদ প্রত্যাবর্তন দেশের জন্য অবশ্যই গভীর আনন্দের, তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার সামগ্রিক নিরাপত্তা অটুট না রাখতে পারলে চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে কোনওভাবেই সবসময় রক্ষা পাওয়া যাবে না।












Click it and Unblock the Notifications