বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন কাণ্ডে নাটকীয় মোড়, এনকাউন্টারে খতম অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় নাটকীয় মোড়। পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু হল এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। পুলিশ সূত্রে খবর, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রভাসকে বারুইপুরের সূর্যপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই পালাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সে।
এই ঘটনার পাশাপাশি পুলিশ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতের নাম কবীর মোল্লা। কবীরকে নিয়ে এই গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মোট গ্রেফতারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল চারে। মূল অভিযুক্তের মৃত্যু এবং নতুন করে গ্রেফতারের পর এলাকায় টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

কী ঘটেছিল মঙ্গলবার রাতে সূর্যপুরে?
বারুইপুর পুলিশ জেলা সূত্রের খবর, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনার বিবরণ খতিয়ে দেখতে এবং সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে প্রভাসকে নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে যান তদন্তকারীরা। অকুস্থল সূর্যপুরে নিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল তা দেখানোর সময় আচমকাই উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশের দাবি, অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ওখান থেকে পালানোর ছক কষেছিল প্রভাস।
তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে পুলিশকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে প্রভাস। সে আচমকাই এক পুলিশ কর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায় সে। আত্মরক্ষার্থে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়।
গুলি বিনিময়ের জেরে বুকে গুলি লেগে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রভাস মণ্ডল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধার করে গুরুতর জখম অবস্থায় বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-পরীক্ষার পর প্রভাসকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই এনকাউন্টারের জেরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তের ধারা
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনার তদন্ত শুরু করার পর পুলিশের হাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ এসেছিল। সেই ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, ঘটনার রাতে ওই নাবালিকার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল প্রভাস মণ্ডল। এই প্রধান সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ প্রভাসকে চিহ্নিত করে এবং তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারের পর প্রভাস মণ্ডলকে দফায় দফায় জেরা করতে থাকেন তদন্তকারীরা। প্রথমে সে ক্রমাগত নিজের বয়ান বদলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে সে এবং তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই একটি মাঠ থেকে নাবালিকার বস্তাবন্দি নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রভাসকে লাগাতার জেরার মাধ্যমেই এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের নাম সামনে আসে। সেখান থেকেই হদিশ মেলে লালন বিশ্বাস ও অন্য অভিযুক্তদের। সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া কবীর মোল্লা এই চক্রের চতুর্থ সদস্য। তদন্তকারীদের অনুমান, এই ঘটনার পেছনে আরও গভীর কোনও চক্রান্ত ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনিক চাপ ও অপরাধীদের প্রতি কড়া বার্তা
বারুইপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে খোদ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অপরাধীদের কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না এবং এই ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
রাজ্যের পুলিশ প্রধান বা ডিজিপি পদাধিকারী রাজীব কুমার নিজেই বারুইপুরে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। পুলিশ বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার কিনারা করা হয়। একই সঙ্গে তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো রকম গাফিলতি বা ঢিলেমি ধরা পড়লে তীব্র ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।
প্রশাসনের এই কড়া চাপের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এই এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটল। স্থানীয় মহলের একটি বড় অংশের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে এবং দ্রুত বিচারের স্বার্থে পুলিশ এই কড়া পদক্ষেপের পথ বেছে নেয়। তবে অভিযুক্তের আকস্মিক মৃত্যুতে তদন্ত প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো প্রতিবন্ধকতা আসবে কি না তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ওপর হামলা
নাবালিকা মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই বারুইপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ দেখায় উত্তেজিত জনতা। এই উত্তেজনার মধ্যেই রণক্ষেত্রের রূপ নেয় এলাকা এবং ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা তদন্তে যাওয়া পুলিশ কর্মীদের ওপর চড়াও হন। বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী এতে আহত হয়েছিলেন।
সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং পুলিশের ওপর হিংসাত্মক হামলার ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়নি জেলা প্রশাসন। ওই হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও রেকর্ডিং খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশ ইতিমধ্যেই প্রায় ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
বারুইপুরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে। যেকোনও ধরনের নতুন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা যারা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে এবং সরকারি কর্মীদের ওপর হামলা চালাবে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পৈশাচিক এই ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর মূল অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যু এবং চারজন সহযোগী গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্তের একটি বড় পর্যায় সমাপ্ত হল। তবে মূল অপরাধী শেষ হয়ে গেলেও বাকিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করে নির্যাতিতার পরিবারকে প্রকৃত বিচার পাইয়ে দেওয়াই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।












Click it and Unblock the Notifications