আসল তৃণমূল কংগ্রেস কার? কমিশনের নতুন সময়সীমা বাড়াতেই আরও তুঙ্গে উঠল রাজনৈতিক উত্তেজনা!
আসল তৃণমূল কংগ্রেস কারা? এই নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের মাঝে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাজনীতিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নজিরবিহীন মোড় এল। 'আসল তৃণমূল’ হিসেবে নিজেদের প্রমাণের মরিয়া চেষ্টায় থাকা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে তাঁদের দাবির সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার জন্য বাড়তি সময় দিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে দলের রাশ কার হাতে থাকবে সেই লড়াই আরও কয়েকদিন দীর্ঘায়িত হতে চলেছে।
পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই দুই পক্ষকে নিজেদের বিরোধের আইনি জবাব দিতে বলেছিল নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির নির্দিষ্ট সময়ের মাঝেই তাদের সবিস্তার উত্তর জমা দিয়ে নিজেদের আইনি অভিভাবকত্ব দাবি করে। কিন্তু ঋতব্রত শিবিরের আইনজীবী কমিশনের কাছে অতিরিক্ত সময় চেয়ে আবেদন করায় পরিস্থিতি সাময়িকভাবে বদলে যায় এবং কমিশন তা মঞ্জুর করে।

কমিশনের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক জট ও পরবর্তী পদক্ষেপ
রাজনৈতিক মহলের নজর এখন নির্বাচন কমিশনের এই সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের গতিপ্রকৃতির দিকে। তৃণমূলের মূল নেতৃত্ব তথা কালীঘাট শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা নিয়ম মেনেই তাদের বিস্তারিত রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাদের জমাপ্রাপ্ত নথিতে ঋতব্রত শিবিরের সমস্ত দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের স্পষ্ট দাবি, মূল দলের রাশ কার হাতে রয়েছে তা প্রমাণিত সত্য।
অন্যদিকে, উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী নিজেদের গুরুত্বকে খাটো করে দেখাতে নারাজ। আইনি লড়াইয়ে কোনও ফাঁক বা ত্রুটি না রাখতেই মূলত তারা এই বাড়তি সময় চেয়েছিলেন। তাদের লক্ষ্য হল, দলের আসল উত্তরাধিকার দাবি করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র এক জায়গায় করে কমিশনের কাছে জোরদার সওয়াল করা। সে কারণেই তারা ১০ জুলাই পর্যন্ত এই সময় চেয়ে নেন।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই দেশের নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক নির্বাচন, দলের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী কারা এবং সামগ্রিকভাবে দলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই বিপরীত শিবিরের কাছেই বিশদ জবাব তলব করেছিল। কমিশন জানতে চেয়েছিল, ঠিক কীসের ভিত্তিতে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে এই দুই পক্ষ। সেই নোটিশ পাওয়ার পরেই রাজ্য রাজনীতিতে এই আইনি তরজা অন্য মাত্রা লাভ করে।
আপত্তি ও পাল্টা আপত্তির আইনি লড়াই
এই বিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত জাতীয় নির্বাচন কমিশনের একটি শুনানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সামনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এক প্রতিনিধি দল সশরীরে হাজির হয়ে নিজেদের বক্তব্য পেশ করেছিলেন। সেই সময় এই বৈঠককে ঘিরে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরাসরি আপত্তি জানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের মূল সাংগঠনিক কমিটি।
কালীঘাট শিবিরের মূল আপত্তি ছিল যে, নির্বাচন কমিশন সাধারণত কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের অনুমোদিত এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কোনও তৃতীয় পক্ষকে এভাবে শুনানির তরফ হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয় না। এই ক্ষেত্রে সেই প্রথাগত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিক্ষুব্ধ পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা কমিশনের নিজস্ব কার্যপ্রণালীর পরিপন্থী। তবে সমস্ত আপত্তি সত্ত্বেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিশন দুই পক্ষের বয়ানই শোনার সিদ্ধান্ত নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক এবং দলের নামের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার এই রূপ ক্ষমতার লড়াই ভারতীয় গণতন্ত্রে নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেশের একাধিক বড় রাজনৈতিক দলে এমন ভাঙন ও চিহ্নের অধিকার নিয়ে তুমুল মামলা দেখা গিয়েছে। সাধারণত, রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বিধায়ক-সাংসদদের সংখ্যাধিক্য এবং দলের জাতীয় কর্মসমিতির সিংহভাগ সদস্যের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই এই ধরনের বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।
১০ জুলাইয়ের পর কোন দিকে ঘুরবে রাজনীতির হাওয়া?
আগামী ১০ জুলাই ঋতব্রত শিবির তাদের দাবি সপক্ষে সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার পরই মূলত আসল পরীক্ষা শুরু হবে। নির্বাচন কমিশন উভয় শিবিরের জমাকৃত নথি, পূর্ববর্তী সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং বিরোধের প্রতিটি আইনি দিক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নজিরবিহীন এই জাতীয় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সমস্ত নথি খতিয়ে দেখা ছাড়া কমিশনের কাছে বিকল্প পথ নেই।
দল কার দখলে থাকবে—এই আইনি নিষ্পত্তির সরাসরি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী ও জনসমর্থকদের ওপর। সাধারণ স্তরের কর্মীদের মনের বিভ্রান্তি দূর করতে দলের প্রতীক কার অধীনে থাকবে, তা আইনি সিলমোহর দিয়ে স্পষ্ট হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ ও চব্বিশের লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে এই মামলার প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির গুরুত্ব অপরিসীম।
কোনো রাজনৈতিক দলের মূল কাঠামো ও পরিচালনার ভার শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষের অনুকূলে যায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘ তর্ক বিতর্ক চলে। তবে আপাতত নির্বাচন কমিশনের এই নতুন সময়সূচি দুই বিবদমান পক্ষকেই নিজেদের দাবি মজবুত করার শেষ সুযোগ এনে দিল। এখন দেখার, ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ঋতব্রত পক্ষ এমন কী নতুন তথ্য প্রমাণ সাজিয়ে আনে, যা মূল তৃণমূলের অন্দরে বড় কোনো পরিবর্তনের জোয়ার আনতে পারে।












Click it and Unblock the Notifications