মার্কিন আইনি জট কাটতেই ঘুরে দাঁড়াল আদানি! ফিরল বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের ভরসা

মার্কিন মুলুকে আইনি জট কেটে যাওয়ার পরেই বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পূর্ণমাত্রায় ফিরে পেতে শুরু করেছে আদানি গ্রুপ। পরিকাঠামো সেক্টরের এই প্রথম সারির ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা) বিনিয়োগের এক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই বিপুল পরিমাণ মূলধন সংগ্রহের মধ্য দিয়ে আদানি গোষ্ঠী তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের এক নতুন এবং আগ্রাসী অধ্যায়ে পদার্পণ করল।

বন্দর, খনি এবং উৎপাদন শিল্পের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলিতে এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আদানি গ্রুপ তাদের পূর্ববর্তী রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে সরে এসে বড় আকারে ব্যবসায়িক রণকৌশলে ফিরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িক অস্থিরতা ও বহুমুখী বিতর্ক কাটিয়ে উঠে এই বিপুল পুঁজি সংগ্রহ আদানিদের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের সপক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা।

Gautam Adani announces massive billion-dollar infrastructure investment strategy

গ্রুপের মূল ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানি আদানি এন্টারপ্রাইজ তাদের শেয়ার বিক্রির মূল লক্ষ্যমাত্রা এক ধাক্কায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫,০০০ কোটি টাকা বা প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে গিয়েছে। বাজারে আদানির শেয়ারের প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিপুল চাহিদাই এই সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি ছিল। ক্যাপিটাল গ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাক্স, ভ্যানগার্ড এবং ব্ল্যাকরকের মতো বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই শেয়ার ক্রয়ে অংশ নিয়েছে।

আদানিদের এই মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে তাদের অন্যতম বৃহত্তম অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর ঠিক আগেই আবুধাবি ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানির (আইএইচসি) সাথে পূর্ব ভারতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন প্রকল্প গড়ে তোলার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই নতুন যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১১.৫ বিলিয়ন ডলার যৌথ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভারতের ভারী ধাতু উৎপাদন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

একই সপ্তাহে আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এপিএসইজেড) বিশ্বখ্যাত শিপিং জায়ান্ট মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) সাথে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছে। অংশীদারিত্বের এই নতুন রূপরেখায় কেরলের গুরুত্বপূর্ণ উইঝিনঝাম আন্তর্জাতিক গভীর সমুদ্র বন্দরে এমএসসি সরাসরি ৪৯ শতাংশ মালিকানা লাভ করবে। এর ফলে দক্ষিণ ভারতের এই রণকৌশলগত গভীর সমুদ্র বন্দরটির বৈস্ময়িক বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে এই লাভজনক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতে কিছুটা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। কেরলের রাজ্য সরকার এই নতুন চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে কোনও পূর্ব আলোচনা ছাড়াই এই চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত বছর কেরলের উপকূলে এমএসসির একটি মালবাহী জাহাজের দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য প্রশাসন এখন এই বিশ্বব্যাপী শিপিং সংস্থার ভারতীয় বন্দরে প্রবেশ নিয়ে চূড়ান্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বহু অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আইনি জটিলতা থেকে আদানি গোষ্ঠীের সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টিই আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের মনে এই প্রবল বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি গৌতম আদানি এবং সাগর আদানির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলাটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে আদানির নামের সাথে জড়িত দীর্ঘদিনের একটি বড় বিতর্ক শেষ হয়েছে।

পাশাপাশি আদানি এন্টারপ্রাইজ মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আনা ঋণ নথির বিষয়টির সমাধান করেছে। একই সাথে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিয়মের অধীনে চলা অন্যান্য ছোটখাট তদন্তের অবসান ঘটেছে। আদানি গ্রুপ প্রথম থেকেই সমস্ত বেআইনি কার্যকলাপের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছিল, যা আইনি নিষ্পত্তির মাধ্যমে আরও জোরালো প্রমাণিত হল।

নাইকা অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস-এর শীর্ষ কর্মকর্তা সুনীল চণ্ডীরমনী এই পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আদানি গোষ্ঠী এখন তাদের আগের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ছেড়ে আবার পূর্ণ গতিতে সাম্রাজ্য বাড়াতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক অর্থ সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং একাধিক হাই-প্রোফাইল পার্টনারশিপ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ফাণ্ড ম্যানেজাররা আদানিদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো উন্নয়নের গল্পে আবারও বড় বড় লগ্নির ঝুঁকি নিতে কোনও দ্বিধা করছেন না।

২০২৩ সালের শুরুতে মার্কিন শর্ট-সেলার সংস্থা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের তোলা কেলেঙ্কারির অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির করা কড়া তদন্তের জেরে আদানিদের ব্যবসার নেটওয়ার্কে বিপুল মন্দার আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে আদানিদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্যের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আদানি গোষ্ঠীর সমস্ত শেয়ারের যৌথ বাজার মূলধন আবার ২০০ বিলিয়ন ডলারের রাজকীয় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

সংস্থার শেয়ার বাজারে এই চোখ ধাঁধানো প্রত্যাবর্তনের কারণে সুফল পেয়েছেন স্বয়ং গোষ্ঠীর প্রধান গৌতম আদানিও। এই বছরের ব্যবধানে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ফের বিপুল লাফ দেখা গিয়েছে, যা তাঁকে এশিয়ার শীর্ষ ধনকুবেরদের উচ্চাসনে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের অভিমত, সংগৃহীত এই নতুন বিপুল আর্থিক রসদ আগামী দিনে আদানিদের লজিস্টিকস, পরিবেশবান্ধব করিডোর, সবুজ শক্তি ও ভারী শিল্প ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বড় বিনিয়োগের মূল চাবিকাঠি হতে চলেছে।

বিগত কয়েক বছরের অভাবনীয় ঝড়ঝাপ্টা এবং আইনি চাপ অগ্রাহ্য করে আদানির এই ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো ভারতীয় কর্পোরেট জগতের অন্যতম একটি নিদর্শন হয়ে রইল। আমেরিকার আদালতের সবুজ সংকেতের পর তাদের নতুন এই ১৫ বিলিয়ন ডলারের লগ্নি দেশের মেগা পরিকাঠামোর গতি পরিবর্তন করতে পারে। পরিবেশগত উদ্বেগ ও রাজ্যের প্রশাসনিক টানাপোড়েন যদি আদানি গ্রুপ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে এই বিপুল বিনিয়োগ নতুন দিশা দেখাবে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+