বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এমন হার কেন? পেনাল্টি মিসের দায় নিয়ে মুখ খুললেন কোচ কার্লো আনসেলোত্তি
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের কাছে ১-২ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। উত্তেজনাপূর্ণ এই ম্যাচে ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পিছনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে রইলেন মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারেজ। প্রথমার্ধে তাঁর পেনাল্টি মিসের মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে পুরো দলকে। ভিনিসিয়াস জুনিয়র মাঠে থাকা সত্ত্বেও কেন গিমারেজ শট নিলেন, তা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন কোচ কার্লো আনসেলোত্তি।
খেলার প্রথমার্ধে ব্রাজিল পেনাল্টি পাওয়ার পর কোটি কোটি সমর্থক নিশ্চিত ছিলেন যে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সফল পেনাল্টি নেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিনিসিয়াস জুনিয়রই কিকে এগিয়ে আসবেন। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে চাপের মুহূর্তে স্পট-কিক নিতে এগিয়ে আসেন ব্রুনো গিমারেজ। তাঁর নেওয়া দুর্বল শটটি নরওয়ের গোলরক্ষক আরিয়ান ন্যাল্যান্ড দারুণভাবে প্রতিহত করেন। এই মিসটিই খেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয় এবং ব্রাজিলের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

কেন ব্রুনো ছিলেন পছন্দ? ব্যাখ্যা আনসেলোত্তির
ম্যাচ পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে দলের হেড কোচ কার্লো আনসেলোত্তি পেনাল্টি নেওয়ার এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। ইতালীয় এই অভিজ্ঞ কোচ স্পষ্ট জানান যে, ব্রাজিলের মতো দলে পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্তটি মাঠের ভিতর আচমকা নেওয়া হয় না। এর একটি সুনির্দিষ্ট পূর্বনির্ধারিত তালিকা আগে থেকেই প্রস্তুত করা থাকে। দলের সেরা ফুটবলাররাই এই তালিকার শীর্ষে থাকেন এবং সেই নিয়ম মেনেই মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আনসেলোত্তির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের দলে পেনাল্টি নেওয়ার এক নম্বর পছন্দ হলেন অভিজ্ঞ নেইমার এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন উইঙ্গার রাফিনহা। তবে নকআউট ম্যাচের প্রথমার্ধে যখন পেনাল্টিটি হয়, তখন দুর্ভাগ্যবশত এই দুই বিশ্বমানের তারকার কেউই মাঠে উপস্থিত ছিলেন না। সেই পরিস্থিতিতে তালিকার তিন নম্বরে থাকা ব্রুনো গিমারেজের ওপর স্বাভাবিকভাবেই শট নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তিনিই পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান।
ইতালীয় এই কোচ আরও যোগ করেন যে, অনুশীলনের সময় ব্রুনো গিমারেজ পেনাল্টি স্পট থেকে অত্যন্ত চমৎকার পারফর্ম করেছিলেন। সে কারণে দল এবং কোচিং স্টাফের তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা ছিল। আনসেলোত্তি বলেন, "ফুটবলে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। ব্রুনো কঠোর অনুশীলন করেছিল এবং আমরা আস্থাশীল ছিলাম। কখনও বল জালে জড়ায়, আবার কখনও গোলরক্ষক দারুণভাবে শরীর ছুড়ে দিয়ে গোললাইন থেকে বল বাঁচিয়ে দেন।"
এই যৌক্তিক ব্যাখ্যার পর বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মনে ঘুরপাক খাওয়া এক জটিল প্রশ্নের অবসান হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের পেনাল্টি নেওয়ার দারুণ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁকে বল স্পর্শ করতে দেওয়া হলো না, তা পরিষ্কার হল। সেলেকাও শিবির স্পষ্ট করেছে যে মাঠে ব্যক্তিগত খ্যাতির চেয়ে দলের অভ্যন্তরীণ নিয়মশৃঙ্খলা, পূর্বনির্ধারিত ছক এবং খেলোয়াড়দের প্রতি পারস্পরিক বোঝাপড়াই তাঁদের কাছে অনন্য অগ্রাধিকার পেয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবে নরওয়ের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের রেকর্ড কখনই খুব একটা ভালো নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম মহাশক্তিধর দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেলেকাওরা নরওয়েকে পরাস্ত করতে অতীতেও বারবার বেগ পেয়েছে। বিশ্বকাপের এই গুরুত্বপূর্ণ নকআউট রাউন্ডের ম্যাচে ব্রাজিলের সেই পুরনো দুর্ভাগ্যের ইতিহাসই যেন আবার ফিরে এসেছে। প্রথমার্ধে গিমারেজের পেনাল্টি মিসের ঘটনাটি ব্রাজিলের দলের মধ্যে দীর্ঘদিনের সেই মানসিক ভয় ও বাড়তি চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল এবং ন্যাল্যান্ডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর
মাঠের লড়াইয়ের কথা বলতে গেলে, ব্রুনো যখন পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান, তখন তাঁর রান-আপ এবং শারীরিক ভাষার মধ্যে এক ধরনের মন্থর জড়তা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। গতিপথ বদলে কিছুটা থেমে এগিয়ে গিয়ে তিনি গোলকিপার ন্যাল্যান্ডের ডানদিক লক্ষ্য করে একটি নিচু শট নেন। কিন্তু নরওয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ন্যাল্যান্ড অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শটের দিক আন্দাজ করেন এবং ক্ষিপ্রতার সাথে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি আটকে দেন।
ন্যাল্যান্ডের করা এই অবিশ্বাস্য পেনাল্টি সেভটি নরওয়ে দলকে মানসিকভাবে অভাবনীয় শক্তি জোগায়, যার সুফল তারা দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের খেলায় পুরোপুরি কাজে লাগায়। নরওয়ের প্রধান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড দ্বিতীয়ার্ধে চমৎকার দুটি গোল করে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দেন। হালান্ডের এই আগ্রাসী ফুটবলের পাশাপাশি নরওয়ের ডিফেন্ডারদের কঠোর প্রাচীর ভেঙে ম্যাচে সমতা ফেরানোর সেলেকাওদের সব ধরনের চেষ্টা এবং পরিকল্পিত আক্রমণাত্মক রণকৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়।
খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের সিনিয়র মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে ব্রাজিল দ্বিতীয়বারের মতো আর একটি পেনাল্টি আদায় করতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে মাঠে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে পড়েছিলেন দেশের ফুটবল সেনসেশন নেইমার। তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শট জালে জড়িয়ে ব্যবধান কমিয়ে ২-১ করলেও, ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ন্যূনতম সময় সেদিন ব্রাজিলের ফুটবলারদের হাতে আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তাঁদের নিশ্চিত বিদায় ডেকে আনে।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ট্র্যাজিক বিদায়
ভিনিসিয়াসের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফর্মে থাকা উইঙ্গার মাঠে খেলা সত্ত্বেও তাঁকে কেন পেনাল্টির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হল, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলেছে। কোচ কার্লো আনসেলোত্তি দলের নির্ধারিত নিয়ম এবং রণকৌশলের সপক্ষে যতই যুক্তি খাড়া করুন না কেন, ব্রাজিলের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই অপ্রত্যাশিত পরাজয় এক নির্মম স্বপ্নভঙ্গ এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে আজীবনের এক নতুন ট্র্যাজিক ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।
নরওয়ের বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক পরাজয় লাতিন আমেরিকান ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিলের গৌরবময় পথচলাকে বড়সড় ধাক্কা দিল। অন্যদিকে ফেভারিট ব্রাজিলকে অনেক আগেই বিদায় নিয়ে একরাশ হতাশা বুকে চেপে ঘরের পথ ধরতে হচ্ছে। ব্রুনো গিমারেজের প্রথমার্ধের সেই আক্ষেপের পেনাল্টি মিসটিই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের দুর্ভাগ্যজনক বিদায়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল এবং নরওয়ের ফুটবলে এক সোনালী ইতিহাস রচনা করল।












Click it and Unblock the Notifications