বনেদিয়ানার ঐতিহ্য, দুর্গার সঙ্গে এই বাড়িতে পুজো হয় দক্ষিণরায়ের
বনেদিয়ানার ঐতিহ্য, দুর্গার সঙ্গে এই বাড়িতে পুজো হয় দক্ষিণরায়ের
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আর বাকি কয়েকটা দিন। যাওয়া যাক আন্দুল-মৌড়ির পুজোর আঙিনায়, বনেদিয়ানার ঐতিহ্য এখানে গলা জড়িয়ে বসে রয়েছে।

ইতিহাস
রাত তখন নিশুতি, নবাবের রংমহল থেকে ভেসে আসছে বাইজির ঘুঙুরের আওয়াজ। এমন নিশুতি রাতে আঠাশ দাঁড়ির দুইটি বজরায় চুপিচুপি উঠছেন করা? আরে ওঁরা তো রতিকান্ত কুশারী আর সতীকান্ত কুশারী ও তাঁদের পরিবার। বর্ধমানের কুশগ্রাম থেকে এসেছিলেন বলে তাঁদের পদবী কুশারী। গণিত বিদ্যায় অসাধারণ পারদর্শী এই দুই ভাইকে নবাব গো-মাংস খাইয়ে ধর্ম চ্যুত করবেন বলে রাতের অন্ধকারে পরিবার সহ ভেসে চললেন দুই ভাই অজানার পথে। ভাগীরথী পার হয়ে তাঁরা ঢুকলেন সরস্বতী নদী পথে।

নৌকা যাত্রা
দুইদিন নৌকোযাত্রার ধকলে বড়ভাই রতিকান্তর আসন্ন প্রসবা স্ত্রীয়ের প্রসব বেদনা উঠল। ছোটভাই সতীকান্ত কে না থেমে এগিয়ে যাওয়ার উপদেশ দিয়ে, রতিকান্ত বজরা ভেড়ালেন সরস্বতী নদীর তীরে ছোট্ট এক জনপদে। সাল-তারিখের নিয়মে সে আজ থেকে প্রায় তিনশ পঞ্চাশ বছর আগেকার ঘটনা। সৌভাগ্য বশত রতিকান্তের এক পরমা সুন্দরী কন্যাসন্তান হয়। পরবর্তী কালে তিনি নিজের বুদ্ধির বলে অনেক অর্থ উপার্জন করেন। আর সতী কান্তের বজরা ভেড়ে গোবিন্দপুর গ্রামের পাথুরিয়া ঘাটাতে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এরাই হলেন কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের পূর্ব পুরুষ। রতিকান্ত যে জনপদে ঘর বেঁধেছিলেন সেই জনপদই আজকের আন্দুল-মৌড়ি। এই রতিকান্ত কুশারীর জামাতাই এনাদের বংশে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন, যা বর্তমানে মৌড়ি রায় বাড়ির পুজো হিসাবে বিখ্যাত। যদিও সঠিক সন তারিখ পাওয়া যায় না, তবুও এই পুজোর বয়স ৩৩০ বছরের অধিক।

দক্ষিণ রায়ের মন্দির
এই পুজো নীতি ও নিষ্ঠায় আপন গৌরব গরিমা আজও ধরে রেখেছে। ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবার আজও একান্ন হয় মায়ের ডাকে। এই পুজোর এক অন্যতম রীতি দশমীতে বাড়ির প্রাঙ্গনে বাঘের রাজা দক্ষিণ রায়ের পূজা। আজ থেকে অন্তত তিনশ বছর আগে এই অঞ্চল ছিল জলে জঙ্গলে পরিপূর্ণ। কথিত আছে আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগে এক দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় প্রতিমা বাহকদের ওপর বাঘের আক্রমণ হয়। তার হাত থেকে বাঁচার জন্য তদানীন্তন পূর্বপুরুষ এখানে দক্ষিণ রায়ের মন্দির নির্মাণের চেষ্টা করলেও তা বারবার ভেঙ্গে পড়ে।

দক্ষিণ রায়ের পূজা
তখন বাড়ির প্রাঙ্গণে বিজয়া দশমীর দিন দক্ষিণ রায়ের পূজা প্রচলিত হয়।এই পূজা দক্ষিণ রায়ের মাথা অঙ্কিত "বারা" অর্থাৎ ধড় বিহীন মুন্ডের দ্বারা সম্পন্ন হতো। এই পূজার আর এক বনেদিয়ানা হলো মহিয়াড়ি অঞ্চলের যত বারোয়ারি ও বাড়ির দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো তাঁরা এই বাড়ির প্রাঙ্গণে দশমীর বিজয়ার আগে প্রতিমা নিয়ে উপস্থিত হয়ে তারপর সরস্বতী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন করেন। এখন সরস্বতী নদীর নাব্যতা অত্যন্ত ক্ষীণ হওয়ার জন্য, প্রতিমা এই পরিবারের প্রতিষ্ঠিত পুকুরে বা অন্য অন্য জায়গায় নিরঞ্জিত হয়। কথিত আছে এটি রায় বংশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে নজরানা হিসেবে প্রচলিত হয়।












Click it and Unblock the Notifications