আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা ইংল্যান্ড কিংবদন্তি বেন স্টোকসের
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনা থেকে চিরতরে বিদায় নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন ইংল্যান্ড টেস্ট দলের বর্তমান অধিনায়ক তথা আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ট্রেন্ট ব্রিজে চলমান টেস্ট ম্যাচটি খেলে ওঠার পরেই নিজের সুদীর্ঘ এবং গৌরবময় আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ইতি টানবেন তিনি। ওয়ানডে আর টি২০ বিশ্বকাপের পর লাল বলের ক্রিকেটকেও তাঁর বিদায় জানানোর এই ঘোষণা বিষাদের হাওয়া ছড়িয়েছে ব্রিটিশ ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে।
চলতি টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের নিজের এই কঠিন সিদ্ধান্তের কথা জানান স্টোকস। তাঁর এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরেই ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে। আধুনিক ক্রিকেটে স্টোকস কেবল একজন সাধারণ খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক লড়াকু মানসিকতার কাণ্ডারি, যিনি ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলকে বহু বছর পর খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছেন নতুন দিগন্তে।

লড়াকু এই অলরাউন্ডারের অবসর ঘোষণার পরপরই ইসিবির চেয়ারম্যান রিচার্ড থম্পসন তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। থম্পসন এক আবেগঘন বিবৃতিতে বলেন, বেন স্টোকস তাঁর প্রজন্মের অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিচ্ছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স, জয়ের জন্য তীব্র ক্ষুধা এবং বড় ম্যাচে অসাধারণ চরিত্র ধারণ করার ক্ষমতা আগামী বহু বছর ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইসিবি প্রধান আরও মনে করিয়ে দেন যে, দেশের হয়ে স্টোকস যা করেছেন, তা অতুলনীয়। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০২২ সালের টি২০ বিশ্বকাপ জয়ের মহানায়ক তিনি। এছাড়া ২০১৯ সালে অ্যাশেজ সিরিজে হেডিংলিতে তাঁর অতিমানবীয় ইনিংসটির কথা ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। অধিনায়ক হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে টেস্ট দলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি এবং মাঠের ক্রিকেটে ফিরিয়ে এনেছেন নতুন উন্মাদনা।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে জো রুটের বিদায়ের পর যখন স্টোকসের কাঁধে ইংল্যান্ডের লাল বলের দলের নেতৃত্ব অর্পণ করা হয়, তখন দলটির অবস্থা বেশ সঙ্গীন ছিল। কিন্তু দায়িত্ব পেয়েই প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের সাথে জুটি বেঁধে ইংল্যান্ডের টেস্ট খেলার ধরনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনেন তিনি। বিশ্ব ক্রিকেট পরিচিত হয় 'বাজবল’ (Bazball) নামক এক অতি-আগ্রাসী ঘরানার সাথে, যা টেস্ট ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
স্টোকসের ক্ষুরধার ও নির্ভীক নেতৃত্বের কারণেই ইংল্যান্ড দল মাঠে ড্র করার প্রথাগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে যে কোনো পরিস্থিতিতে জয় ছিনিয়ে আনার মানসিকতা অর্জন করে। প্রথাগত টেস্টের ব্যাকরণ ভেঙে ওভার প্রতি রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেওয়া এবং সাহসী ডিক্লেয়ারেশনের মাধ্যমে তিনি দলটির ড্রেসিংরুমে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জোয়ার এনেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ইংল্যান্ড বিশ্ব দরবারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় টেস্ট দল হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
বেন স্টোকসের কেরিয়ারের কথা বলতে গেলে ২০১৯ সালের সেই অবিস্মরণীয় গ্রীষ্মের স্বর্ণালী অধ্যায়ের কথা প্রথম লাইনেই চলে আসে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর অপরাজিত ৮৪ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসটি ম্যাচটিকে চিরস্মরণীয় টাইয়ের দিকে নিয়ে যায়। এরপর সুপার ওভারের শ্বাসরুদ্ধকর নাটকের পর ইংল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের শোকেসে তুলতে সক্ষম হয়।
সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার ঠিক কয়েক সপ্তাহ পরেই অ্যাশেজ সিরিজে কার্ডিফের ব্যর্থতা ভুলে হেডিংলিতে ইতিহাস গড়েন স্টোকস। অজি বোলারদের বিষাক্ত আক্রমণ রুখে দিয়ে পিচে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন তিনি। শেষ উইকেটে জ্যাক লিচের সাথে জুটি বেঁধে অপরাজিত ১৩৫ রান করে ইংল্যান্ডকে এক উইকেটের রুদ্ধশ্বাস জয় উপহার দেন তিনি। বিশ্বের বড় বড় ক্রিকেট বিশ্লেষকরা সেই মহাকাব্যিক জয়কে টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা একক লড়াইয়ের তকমা দিয়েছিলেন।
২০১১ সালে সাদা বলের ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়া স্টোকসের ২০১৩ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে রাজকীয়ভাবে ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে অভিষেক ঘটে। তিনি বরাবরই ছিলেন বড় মঞ্চের নির্ভীক লড়াকু। কেবল ব্যাট হাতেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বল হাতেও তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের অন্যতম ভরসাবিন্দু। ২০১৬ সালে কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুর্দান্ত ২৫৮ রানের ইনিংসটি আজও টেস্ট ক্রিকেটের মূর্তিমতি বিনোদনের পরিচয় বহন করে।
তবে বিগত কয়েক বছর ধরে পিঠ, হ্যামস্ট্রিং এবং গোড়ালির গুরুতর চোট বারবার তাঁর স্বপ্নযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া কেরিয়ারের চড়াই-উতরাই ও মানসিক স্বাস্থ্যের কারণেও একসময় ক্রিকেট থেকে সংক্ষিপ্ত বিরতি নিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রতিবারই চোট ও অন্যান্য প্রতিকূলতা কাটিয়ে মাঠে ফিরেই দলের কঠিন বিপদে অনন্য প্রত্যয় নিয়ে ধরা দিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ ও ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে কেবল দেশপ্রেম ও জেদের জোরে লড়ে গেছেন তিনি।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ট্রেন্ট ব্রিজের চলতি এই টেস্ট ম্যাচটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে ব্রিটিশ ক্রিকেটের একটি গৌরবময় স্বর্ণযুগের চিরতরে অবসান ঘটবে। একজন সফলতম অধিনায়ক হিসেবে সতীর্থদের সাহস জুগিয়ে নিজে একবারে শীর্ষস্থানে থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে চিরবিদায় জানানোর সিদ্ধান্তই নিলেন বেন স্টোকস। তাঁর এই অসাধারণ লড়াই করার ক্ষমতা এবং ভয়হীন খেলার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব ক্রিকেটের বুকে এক অনন্য রাজকীয় দলিল হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অলরাউন্ডারদের চিরকাল পথ দেখাবে।












Click it and Unblock the Notifications