মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা! মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ হামলা, ট্রাম্পের কঠোর হুঙ্কার
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক মারাত্মক যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে সই হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাল ইরান। রবিবার ভোরে কুয়েত ও বাহরিনে মোতায়েন মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে এই যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের এই আকস্মিক পদক্ষেপে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ইরানের এই অভাবনীয় হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তেহরান যদি এই উসকানি অব্যাহত রাখে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন সামরিক পদক্ষেপ নেবে যার ফলে ইরান নামক রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। অন্যদিকে, আইআরজিসি-র নৌবাহিনীও পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে বলেছে, আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি এক জ্বলন্ত 'নরকে’ পরিণত হবে।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শনিবার দিনভর ইরানের উপকূলীয় রাডার এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী যে মারাত্মক বোমাবর্ষণ করেছিল, তারই পাল্টা জবাব হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ইরানের পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অবস্থানে অন্যায়ভাবে হামলা করায় তারা এই প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়েছে।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, তাদের আকাশসীমা সুরক্ষায় থাকা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কয়েকটি 'শত্রুভাবাপন্ন’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সনাক্ত এবং ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই আক্রমণে বাহরিন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি হয়েছে, তা ওয়াশিংটনের তরফ থেকে এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হোরমুজ প্রণালী। ইরানের আইআরজিসি নেভি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে, উপকূলীয় সিরিক দ্বীপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে এই অঞ্চলটিতে তেহরানের যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নীতি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ইরান কঠোর পদক্ষেপ বজায় রাখবে বলেই তারা হুঁশিয়ার করেছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আশঙ্কার জন্ম দিয়ে আইআরজিসি মার্কিন প্রশাসনকে এই চরম অস্থিরতার জন্য সরাসরি দায়ী করছে। তারা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির জন্য স্বাক্ষরিত 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ প্রথম লঙ্ঘন করেছে ওয়াশিংটন। এই পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বন্ধ না হলে চলমান সমস্ত কূটনৈতিক আলোচনা এবং দ্বিপাক্ষিক মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ও শনিবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় পানামার পতাকাবাহী জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার 'এম/টি কিকু’ এবং মালবাহী জাহাজ 'এম/ভি এভার লাভলি’-র ওপর ইরান সমর্থিত ড্রোন হামলা চালানো হয়। প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাওয়ার সময় 'এম/টি কিকু’-তে একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন আঘাত হানে।
এই বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের সামরিক অবস্থান গুঁড়িয়ে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো আবারও যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের দায়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে হানা দিয়েছে। তারা হয়তো কখনই শিক্ষা নেবে না।”
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের জেরে ট্রাম্প আরও তীব্র হুমকি দিয়ে বলেন, “এমন এক সময় আসতে পারে যখন আমাদের আর ধৈর্য ধরা সম্ভব হবে না। আমরা অতীতে যে কাজ শুরু করেছিলাম, তা সামরিকভাবে সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব। তেমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কিন্তু ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের আর কোনো অস্তিত্ব টিকে থাকবে না।” ট্রাম্পের এই বার্তা ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন অভিযানের সময় ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হোরমুজ প্রণালীর কাছে সিরিক দ্বীপ এবং কেশম দ্বীপের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী গোলা আঘাত হেনেছে। এই হামলার পর থেকেই গোটা পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় ইরানের সামরিক বাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা জোরদার করা হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে অর্জিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি এখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি ইরানি আক্রমণ এটাই প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত আর কেবল প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালীতে এই অস্থিরতা চলমান থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। দুই পরাশক্তির এই মুখোমুখি অবস্থানের কারণে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহণ ও বিমা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই তাদের জাহাজগুলোকে এই চরম সংঘাতময় পথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতে শুরু করেছে।
কুয়েত ও বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বড় কোনো মধ্যস্থতা উদ্যোগ না নিলে এই সংঘাত অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।












Click it and Unblock the Notifications