আফগানিস্তানে শক্তিশালী ভূমিকম্প! কাঁপল দিল্লি সহ উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্য
আফগানিস্তানের হিন্দু কুশ পার্বত্য অঞ্চল কাঁপল এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের। এদিন শনিবার সন্ধ্যে ৭টা বেজে ৪ মিনিটে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের প্রাথমিক তীব্রতা মাপা হয়েছে ৬.২। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২১৫ কিলোমিটার গভীরে এই কম্পনের উৎপত্তি হওয়ার কারণে এর চারপাশের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হলেও তাৎক্ষণিক বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই কম্পনে উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলটি ছিল উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের কালাফগান থেকে প্রায় ৮১ কিলোমিটার দূরে। গভীরতা বেশি থাকার কারণে এই কম্পন শুধু আফগানিস্তান বা ভারতের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান ছাড়াও চিন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। তীব্র আতঙ্কের জেরে পাকিস্তানের উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং আফটারশকের ভয়ে ফাঁকা জায়গায় জড়ো হন।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, রিখটার স্কেলে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি যেকোনও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে সক্ষম। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হল, ভূমিকম্পটির উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২১৫ কিলোমিটার গভীরে। ভূবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে 'ডিপ-ফোকাস' বা গভীর উৎসস্থলযুক্ত ভূমিকম্প বলা হয়ে থাকে। এর ফলে ভূকম্পন তরঙ্গের তীব্রতা ভূপৃষ্ঠে উঠে আসার সময় অনেকটাই হ্রাস পায় এবং মারাত্মক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ভূকম্পন বিশেষজ্ঞরা আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, গভীর ফোকাসের কম্পনগুলি অগভীর কম্পনের চেয়ে অনেক বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় অনুভূত হয়। ভূগর্ভের গভীরতম স্তর থেকে নির্গত শক্তি চারদিকের কঠিন শিলাস্তরের মধ্য দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ধাবিত হওয়ার পথ পায়। তবে ভূপৃষ্ঠে তীব্র আঘাত করার মতো একক শক্তি ততক্ষণে ক্ষয় হয়ে যায়। শনিবার সন্ধ্যার ঘটনাতেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে, যার ফলে মধ্য এশিয়ার বিরাট এলাকায় মানুষ কেঁপে উঠলেও বড় ধরনের ঘরবাড়ি বা পরিকাঠামোগত ক্ষতি এড়ানো গেছে।
আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পার্বত্য অঞ্চলের এই বড় ধরনের কম্পনটি মূলত কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে একাধিক মাঝারি ও কম মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড নথিভুক্ত হয়েছে, যা ভূবিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হিমালয়ের সংলগ্ন অঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পরপর সিসমিক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়া ভূগর্ভস্থ ফাটল সৃষ্টি করছে, যা সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।
আফগানিস্তানের এই ভয়াবহ কম্পনটির কয়েক ঘণ্টা আগে, সকালে, হিমাচল প্রদেশের চম্বা জেলায় মাঝারি ধরনের কম্পন অনুভূত হয়েছিল। রিখটার স্কেলে হিমাচলের এই ভূকম্পনের তীব্রতা মাপা হয়েছিল ৩.২। তবে এটি ছিল অত্যন্ত অগভীর বা প্রকৃতির ভূমিকম্প, যার উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার গভীরতায়। ধর্মশালা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে এর উপকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তীব্রতা কম থাকায় সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পর পর চারটি মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার বা ইএমএসসি নামক সংস্থাটি এই ধারাবাহিক কম্পনের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানের এই ধারাবাহিক ভূকম্পনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তীব্র আঘাতটি আসে শনিবার সকাল ৮টা বেজে ৩৬ মিনিটে। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫ এবং এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার গভীরে। এই কম্পনের উপকেন্দ্রটি ছিল বালুচিস্তান অঞ্চলে।
বালুচিস্তানের এই ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও হতাহতের খবর না থাকলেও তা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ভীতির সৃষ্টি করেছে। সিসমোলজিস্টদের মতে, বালুচিস্তান ও পাকিস্তানের সমগ্র পাহাড়ি অববাহিকা মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা অত্যন্ত অস্থির অবস্থায় থাকে। এই প্লেট দুটির মধ্যে ক্রমাগত ঘর্ষণ ও ধাক্কাধাক্কির কারণে ভূগর্ভস্থ শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত হতে থাকে এবং হঠাৎ করেই তা ভূমিকম্প আকারে নির্গত হয়। এর ফলে হিমালয় অঞ্চল এবং তার সংলগ্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত কম্পন অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
ভূকম্পন বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ বেল্ট এবং ভারতীয় উপদ্বীপের উত্তরভাগ জুড়ে বিস্তৃত ফল্ট লাইনগুলো পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্পপ্রবণ অংশ হিসেবে সিসমিক জোনে অবস্থান করছে। এই সক্রিয় ফল্ট লাইনে ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পন হওয়া দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকম্পের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হলেও, সার্বিক সিসমিক নেটওয়ার্ক কিন্তু সতর্ক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার পর পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণে বিশেষ ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করছেন।
আপাতত শনিবারের এই ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্পে বড় কোনো জীবনহানি কিংবা চরম ক্ষয়ক্ষতি না এলেও, এটি প্রতিটি অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলার আধুনিক প্রস্তুতিকে পুনরায় ঝালিয়ে নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। পাহাড়ি এলাকার দুর্বল বসতি বিন্যাস এবং দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ যেকোনো হালকা কম্পনকেও ক্ষতিকারক করে তুলতে পারে। তাই সিসমিক অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সময়োপযোগী সচেতনতা বাড়ানো এবং জরুরি উদ্ধারকারী বাহিনীর কার্যক্ষমতা ২৪ ঘণ্টা সচল রাখাই হবে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ এড়ানোর প্রধান উপায়।












Click it and Unblock the Notifications