'বাংলাদেশে ফিরবই', দেশে ফেরার নতুন টাইমলাইন সেট করে দিলেন শেখ হাসিনা!

বাংলাদেশ থেকে আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতির পর বিগত প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে এক প্রকার নির্বাসনে থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী মেজাজে হুঙ্কার দিলেন। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই তিনি সশরীরে নিজের দেশে ফিরে যাবেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে সম্পূর্ণ খারিজ করেছেন তিনি।

সম্প্রতি একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন। গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়। এই রায়কে সম্পূর্ণ বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ওড়াতে দ্বিধা করেননি তিনি।

Sheikh Hasina speaks out from exile about returning home

প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তার সঙ্গে জীবন কাটানোর পর হাসিনার এই আচমকা বার্তা ঢাকার রাজনৈতিক অলিন্দে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর এই অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলা বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসিনার দাবি, আওয়ামি লিগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন করতেই এই নাটক সাজানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাসিনার এই মন্তব্য কেবল নিজের দলের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙা করার চেষ্টা নয়, বরং বর্তমান প্রশাসনের প্রতি এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ। নির্বাসিত জীবন থেকেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা কতটা বজায় রাখতে চান, এই সাক্ষাৎকার তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা সরাসরি বাংলাদেশের বর্তমান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালের এই একতরফা রায় কোনও আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতিশোধ নেওয়ার একটি নোংরা সুপরিকল্পিত হাতিয়ার মাত্র। বিরোধী কণ্ঠকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিতেই বিচার বিভাগকে অপব্যবহার করা হচ্ছে।

হাসিনা মনে করিয়ে দেন যে, আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে চিরতরে মুছে ফেলার এবং দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। ইতিহাস সাক্ষী, এর আগেও একাধিক বার আইনি ও সামরিক উপায়ে তার দলকে ধ্বংস করার চক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্ত ষড়যন্ত্র যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাহীন হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। তিনি মনে করেন, অনৈতিক উপায়ে ক্ষমতা দখলকারীরা কখনও স্থায়ীভাবে দেশের শাসনভার ধরে রাখতে পারে না। বর্তমান ব্যবস্থার অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি মানসিক এবং রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেও দাবি করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের হাজারও লড়াই ও ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আসা শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানান যে, মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে তাঁকে দমানো যাবে না। এই প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও গম্ভীর হয়ে স্মরণ করেন ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের সেই রক্তঝরা কালো রাতের কথা, যখন তাঁর পিতা তথা বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের প্রায় সমস্ত সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

পারিবারিক ট্র্যাজেডির পাশাপাশি নিজের ওপরে হওয়া একাধিক নৃশংস হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে ২০০৪ সালের ২১ অগাস্টের সেই কুখ্যাত গ্রেনেড হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। হাসিনা বলেন, তাঁকে নিশ্চিহ্ন করতে দফায় দফায় চক্রান্তের জাল বোনা হয়েছে। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করে তিনি সবসময় এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের পাশেই এসে দাঁড়িয়েছেন।

পাঁচবার গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসেছিলেন শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, আর্থিক অগ্রগতি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাস তাঁর নাম ও আওয়ামি লিগের সংগ্রামের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ফলে কোনো কৃত্রিম উপায়ে জনগণের মন থেকে তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও স্পর্শকাতর অংশটি ছিল বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য তাঁর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা। সমস্ত চক্রান্তের জাল চূর্ণ-বিচূর্ণ করে চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার যে প্রতিজ্ঞা তিনি দেখিয়েছেন, তা ঢাকার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে তীব্র রাজনৈতিক অস্বস্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বিদায় নেওয়ার পর ভারতে হাসিনার অবস্থানকে ঘিরে নানা ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। ভারতের কূটনীতি মহলেও এই প্রস্থান এবং তাঁর অবস্থান নিয়ে গভীর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছিল। এই অবস্থায় হাসিনার এমন প্রকাশ্য বিবৃতি দিল্লির ওপর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রার চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাশীল অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য দীর্ঘ দিন ধরেই হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমাগত লবিং ও দ্বিপাক্ষিক চাপ তৈরি করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজেই দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে এমন অটল মনোভাব ও আপসহীন রূপ প্রকাশ করছেন, তখন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, তা অত্যন্ত রহস্যময়।

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপ নিতে চলেছে। একদিকে সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে হাসিনাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দল গোছানোর মরিয়া অঙ্গীকার— এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে দেশের সাধারণ মানুষের নাগরিক জীবন কতটা প্রভাবিত হয়, সেটাই এখন দেখার বড় বিষয়।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+