বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে অভাবনীয় সাফল্য! ১৫ মিনিটের বুকিং সুবিধায় স্বস্তিতে যাত্রী ও রেল দু'পক্ষই

ভারতীয় রেলের একটি সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দক্ষিণ ভারতে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক সাফল্যের ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। ট্রেন ছাড়ার মাত্র ১৫ মিনিট আগে পর্যন্ত খালি আসন বুক করার বিশেষ সুবিধা চালু হওয়ার পর থেকে যাত্রী সংখ্যায় ব্যাপক জোয়ার এসেছে। দক্ষিণ রেলওয়ে জোনের সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক বিবরণী ও পরিসংখ্যান এই সাফল্যেরই ধারাবাহিক প্রমাণ দিচ্ছে।

এই জনবান্ধব উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন শেষ মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের ভ্রমণ অত্যন্ত সহজ হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রেলের লোকসান কমিয়ে আয়ের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা এই নিয়মটি ইতিমধ্যে ভারতীয় রেল ট্রেনের খালি আসন সংরক্ষণের পুরো ঐতিহ্যবাহী ধারণাটুকু বদলে দিতে পেরেছে।

Vande Bharat Express train on tracks in India

দক্ষিণ রেলওয়ের দেওয়া নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এই জোনের ২৪টি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস সার্ভিসে যাতায়াত করেছেন মোট ৭৭.৩৮ লক্ষ যাত্রী। এই বিপুল যাত্রী সংখ্যার বিষয়টি পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের রেকর্ডের তুলনায় অনেক বেশি নজরকাড়া। কারণ সেই অর্থবর্ষে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের মোট যাত্রী সংখ্যা সীমাবদ্ধ ছিল ৫৪.১২ লক্ষের কাছাকাছি।

টিকিটিং ব্যবস্থার এই অভিনব সংস্কার ভারতীয় রেলের বার্ষিক কোষাগারেও বড় অঙ্কের জোয়ার এনেছে। দক্ষিণ রেলের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বন্দে ভারত পরিষেবা থেকে তাদের সংগৃহীত রাজস্বের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৩.৮৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই আয়ের পরিমাণ যেখানে ছিল ৫৪০.৬৫ কোটি টাকা, সেখানে এবার প্রায় ২৬৩ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব বৃদ্ধি হয়েছে।

আয়ের এই ইতিবাচক ধারা কিন্তু নতুন অর্থবর্ষের শুরুতেও একইভাবে অব্যাহত রয়েছে। কেবল ২০২৬ সালের এপ্রিল এবং মে মাসের হিসাব পরীক্ষা করলেই লক্ষ্য করা যায় যে, মাত্র এই দুই মাসের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে দক্ষিণ রেলের বন্দে ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা সফলভাবে ১৫.২১ লক্ষ যাত্রী বহন করেছে এবং রেলের জন্য ১৬২.৯৬ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব নিশ্চিত করে দিয়েছে।

রেলওয়ে আধিকারিকদের মতে, এই বিশেষ বুকিং পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হল ট্রেনের কোনও আসন যেন খালি অবস্থায় যাত্রা না করে। সাধারণ বুকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চার্ট তৈরির নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও যে সমস্ত আসন অবিক্রীত থেকে যায়, সেগুলির বুকিং সহজ করতেই এই ১৫ মিনিটের বিশেষ উইন্ডোটি চালু করা হয়েছে। এর ফলে ট্রেন ছাড়ার একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লাইনে টিকিট কাটার সুযোগ পান সাধারণ মানুষ।

এই পদ্ধতির সবথেকে বড় সুবিধা হল, যাত্রীরা কেবল যে ট্রেনের প্রথম স্টেশন বা প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে টিকিট বুকিংয়ের চমৎকার সুবিধা পাচ্ছেন তা নয়। যাত্রাপথের মধ্যবর্তী যেকোনও স্টেশন থেকেও খালি থাকা সিট অনায়াসে বুক করা যাচ্ছে। আগে এই সীমিত সুযোগ না থাকায় একটি প্রধান স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর পরবর্তী স্টেশনের যাত্রীদের পক্ষে ট্রেনের ভেতরের খালি সিটের হদিশ পাওয়া ছিল কার্যত অসম্ভব।

বর্তমানে দক্ষিণ রেলের আটটি ব্যস্ততম বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনে এই বিশেষ বুকিং সুবিধা পরীক্ষামূলক ও স্থায়ীভাবে চালু রাখা হয়েছে। মূলত কর্পোরেট চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের জন্য এই সুবিধা সবচেয়ে লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে। জরুরি কাজে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে দ্রুত যাতায়াত করতে এই প্রোজেক্ট খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

ভারতীয় রেল সূত্রে আরও জানা গেছে যে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে বন্দে ভারত ট্রেনগুলির আসন অলঙ্করণ বা বুকিংয়ের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এই তথ্য শুনে সাধারণ যাত্রীদের মনে হতে পারে কীভাবে অতিরিক্ত যাত্রী স্থান পাচ্ছেন। কিন্তু এর আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে রেলের সুচারু সিট বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে, যা একটি নির্দিষ্ট আসনকে একই যাত্রাপথে একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ দেয়।

বাস্তব ক্ষেত্রে একজন যাত্রী যখন কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করে ট্রেন থেকে নেমে যান, তাঁর ছেড়ে যাওয়া ওই শূন্য আসনটি পুনরায় অন্য কোনো মধ্যবর্তী স্টেশনের নতুন যাত্রীকে বুকিংয়ের মাধ্যমে দিয়ে দেওয়া হয়। আসন পুনর্বণ্টনের এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থার কার্যকারিতার ফলেই নির্দিষ্ট যাত্রাপথের সামগ্রিক আসন ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে ১১০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ রেলওয়ে জোনের পক্ষ থেকে এমন কয়েকটি অতি ব্যস্ত রুটের বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে শেষ মুহূর্তের টিকিট বুকিং এবং আসন পুনর্বণ্টনের পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। নিচে বিশেষ আটটি ট্রেনের বিস্তারিত সারণী তুলে ধরা হল যেখানে আসন ব্যবহারের হার তুলনামূলক বেশি।

ট্রেন নম্বর যাত্রাপথ (প্রারম্ভিক ও গন্তব্য রেল স্টেশন)
২০৬৩১ ম্যাঙ্গালুরু সেন্ট্রাল থেকে তিরুবনন্তপুরম সেন্ট্রাল
২০৬৩২ তিরুবনন্তপুরম সেন্ট্রাল থেকে ম্যাঙ্গালুরু সেন্ট্রাল
২০৬২৭ চেন্নাই এগমোর থেকে নাগেরকয়েল
২০৬২৮ নাগেরকয়েল থেকে চেন্নাই এগমোর
২০৬৪২ কোয়েম্বাটোর থেকে বেঙ্গালুরু ক্যান্টনমেন্ট
২০৬৪৬ ম্যাঙ্গালুরু সেন্ট্রাল থেকে মাডগাঁও
২০৬৭১ মাদুরাই থেকে বেঙ্গালুরু ক্যান্টনমেন্ট
২০৬৭৭ ডক্টর এমজিআর চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে বিজয়ওয়াড়া

এই আধুনিক বুকিং ব্যবস্থা চালুর ফলে অসংরক্ষিত কামরার উপচে পড়া ভিড় যেমন এড়ানো যাচ্ছে, তেমনই উচ্চমানের বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের আধুনিক পরিষেবাকে সর্বোচ্চ স্তরে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। দ্রুতগামী ট্রেনগুলিতে ফাঁকা টিকিট পাওয়ার এই সহজলভ্যতা ভারতীয় রেলের প্রশাসনিক ও কারিগরি দক্ষতার এক উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন, যা আধুনিক ভারতের উপযোগী পরিষেবা নিশ্চিত করেছে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর ভর করে ট্রেন ভ্রমণের চেনা ছবি বদলে দেওয়ার এই লড়াইয়ে দক্ষিণ রেলওয়ের অভাবনীয় আর্থিক সাফল্য দেশের অন্য সমস্ত রেলওয়ে জোনের কাছে একটি নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। আগামী দিনগুলিতে দেশের অন্যান্য রুটের প্রিমিয়াম ও সাধারণ মেল ট্রেনগুলিতেও টিকিট বিক্রির এই ধরনের গতিশীল ও ব্যবহারকারী-বান্ধব ফর্মুলা প্রয়োগ করা হতে পারে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+