সবুজ জ্বালানি বিপ্লবে বড় ঘোষণা সাগর আদানির! বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ ও সাশ্রয়ী সমাধানে দেখালেন নয়া দিশা
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের (এজিইএল) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাগর আদানি বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ সংযোগ প্রক্রিয়াকরণ বা ইলেকট্রিফিকেশনকে আরও ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শক্তি নিরাপত্তা, মানুষের সাধ্যের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব শক্তির সাথে সঞ্চয় ব্যবস্থার মেলবন্ধন ঘটানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত 'লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইক'-এর অংশ হিসেবে আয়োজিত প্রথম 'আদানি গ্রিন এনার্জি ডায়লগ'-এ এই বক্তব্য পেশ করেন সাগর আদানি। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে বিশ্বের শক্তি সংকট সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল বিদ্যুৎ রূপান্তর প্রক্রিয়াকে গতিশীল করা। যেকোনও দেশের স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

পরিবেশবান্ধব শক্তি তখনই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারে, যখন এর সঙ্গে আধুনিক জ্বালানি সঞ্চয় ব্যবস্থা যুক্ত হয়। সাগর আদানি উল্লেখ করেন যে, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) এবং পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্টের (পিএসপি) মতো উন্নত প্রযুক্তি এই ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছে। আদানি গ্রিন বর্তমানে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ গিগাওয়াট (জিডব্লিউ) ক্ষমতা সম্পন্ন নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা মজবুত করবে।
এই লক্ষ্যপূরণে গুজরাতের খাভড়ায় গড়ে উঠছে বিশ্বের বৃহত্তম নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প। বিশাল আকৃতির এই গ্রিন এনার্জি পার্কটিতে বড় আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অত্যাধুনিক শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা বা স্টোরেজ ইন্টিগ্রেশনের কাজ চলছে। পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রিডে সরবরাহ করা যায়, তার জন্য এই প্রযুক্তিগত সংযোজন অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন শিল্প, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং ডেটা সেন্টারের দ্রুত বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা বিপুল পরিমাণে বাড়ছে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে কার্বন-মুক্ত এবং স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কোনও বিকল্প নেই। লন্ডনের এই গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত নীতি নির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা একমত হয়েছেন যে, ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ দরকার।
পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে আদানি গ্রুপ বিশ্বজুড়ে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংস্থাটি সবুজ শক্তি বা এনার্জি ট্রানজিশনের জন্য ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন, শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা এবং হাই-ভোল্টেজ সঞ্চালন লাইনের আধুনিকীকরণে।
অন্যদিকে, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সুরক্ষাকে আরও দৃঢ় করতে আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি সম্প্রতি একটি বড় ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কোম্পানিটি দেশের সৌর ও বায়ু শক্তির পরিপূরক হিসেবে আগামী দিনে প্রায় ১০ গিগাওয়াট ক্ষমতা বিশিষ্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এই পারমাণবিক শক্তি ভারতের বেস-লোড শক্তির চাহিদা মেটাতে এবং কার্বন নির্গমন কমাতে বড় ভূমিকা পালন করবে।
লন্ডনের এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে বিশিষ্ট লর্ড আডায়ার টার্নার এবং নাইজেল টপিংয়ের মতো বিশ্বখ্যাত পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এনার্জি ট্রানজিশন কমিশনের সহ-সভাপতি লর্ড টার্নার বলেন, শূন্য-কার্বন অর্থনীতি গঠনে বড় আকারের গ্রিন ইলেকট্রিফিকেশন অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে, ইউকে ক্লাইমেট চেঞ্জ কমিটির চেয়ারম্যান নাইজেল টপিং উল্লেখ করেন যে, যেসব ক্ষেত্রে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলিকে দ্রুত বিদ্যুতায়নের আওতায় আনলে তা চমৎকার অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে।
লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইকের এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনটি সফল করতে আদানি গ্রিন পার্টনারশিপ করেছিল 'এনার্জি ট্রানজিশন কমিশন' বা ইটিসির সাথে। সেমিনারে অক্টোপাস এনার্জি, স্নাইডার ইলেকট্রিক, ক্লাইমেট বন্ড ইনিশিয়েটিভ এবং গ্রিন ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের শীর্ষ স্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নীতি নির্ধারণ, বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে বিশ্বমানের এই মঞ্চে আলোচনা করা হয়, যা এনার্জি ট্রানজিশনের গতিপথকে ত্বরান্বিত করবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সমাপ্তি ঘটে লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামে অবস্থিত 'এনার্জি রেভোলিউশনঃ দ্য আদানি গ্রিন এনার্জি গ্যালারি' পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য সাজানো এই ইন্টারঅ্যাক্টিভ গ্যালারিটি ইতিমধ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে যাত্রা শুরু করা এই প্রদর্শনী কেন্দ্রটি মূলত কম-কার্বন শক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়াতে এবং তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রুখতে এবং স্থিতিশীল সমৃদ্ধি অর্জন করতে একযোগে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। শক্তি নিরাপত্তা ও সুলভ বিদ্যুতের এই নয়া সমীকরণ বাস্তবায়নে আদানি গ্রিনের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলির আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ এবং বিশাল বিনিয়োগ আগামী দিনে একটি বাসযোগ্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন।












Click it and Unblock the Notifications