ভোটার, প্যান কার্ড সহ ১৫টি সরকারি নথি জমা দিয়েও প্রমাণ হল না ভারতীয় নাগরিকত্ব! গুয়াহাটি হাইকোর্ট রায়ে কী জানাল?
ভোটার আইডি, প্যান কার্ড, ১৯৫১ সালে তৈরি জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি-র অনুলিপিসহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি জমা দিয়েও নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারলেন না অসমের গুয়াহাটির এক বাসিন্দা। নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি পরিচয়পত্র বা অনুলিপি যে কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, সম্প্রতি এক মামলার রায়ে তা পুনরায় স্পষ্ট করে দিল গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালত সাফ জানিয়েছে, ভারতীয় নাগরিক আইনের জটিল বেড়াজালে কেবল নথির সংখ্যা কোনও বিষয় নয়, বরং তার নির্ভুলতা এবং যোগসূত্রই আসল।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামীমা জাহানের একটি ডিভিশন বেঞ্চ আমিনুল হক নামের ওই ব্যক্তির দায়ের করা রিট পিটিশন খারিজ করে দিয়েছে। ২০১৯ সালে অসমের একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল আমিনুলকে 'বিদেশি’ বলে ঘোষণা করেছিল। ট্রাইব্যুনালের সেই রায়কে অবৈধ দাবি করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। তবে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট জানিয়েছে, আইনগতভাবে এই সমস্ত নথির সত্যতা আদালতে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।

ভোটার আইডি ও প্যান কার্ড নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়
মামলা চলাকালীন আমিনুল হক দাবি করেছিলেন যে তিনি জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। নিজের পরিবার ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকেই অসমে বসবাস করছে তা প্রমাণ করতে তিনি মরিয়া চেষ্টা চালান। এর সপক্ষে ১৯৫১ সালের এনআরসির নথির এক্সট্রাক্ট, ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন বছরের ভোটার তালিকা, ১৯৭৩ সালের জমি কেনাবেচার দলিল, ভোটার পরিচয়পত্র (এপিক), প্যান কার্ড এবং স্কুল সার্টিফিকেট জমা দেন। কিন্তু আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, প্যান কার্ড এবং ভোটার আইডি কার্ড কখনই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পায় না।
এছাড়াও আমিনুল হক তাঁর সপক্ষে ১৯৫১ সালের এনআরসি-র কম্পিউটার থেকে নেওয়া অনুলিপি পেশ করেছিলেন। তবে বিচারপতিদের বেঞ্চ সেই প্রমাণও খারিজ করে দিয়েছে। আদালতের যুক্তি, এই ডিজিটাল নথি বা ইলেকট্রনিক রেকর্ডের সত্যতা প্রমাণের জন্য যে আইনগত প্রক্রিয়া এবং শংসাপত্র প্রয়োজন হয়, তা এখানে যথাযথভাবে মানা হয়নি। আইনি নিয়ম অনুযায়ী তথ্য প্রযুক্তির ধারা মেনে পেশ না করায় আদালত এটিকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
এই মামলার শুনানির সময় সবথেকে বড় আইনি ত্রুটি প্রকাশ পায় আবেদনকারীর সঙ্গে তাঁর পূর্বপুরুষদের রক্তের সম্পর্কের বা বংশগত সংযোগের অভাব নিয়ে। আমিনুল দাবি করেছিলেন যে ভোটার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের পিতাও আদালতের সামনে হাজির হয়ে মৌখিকভাবে স্বীকার করেন যে আমিনুল তাঁর সন্তান। কিন্তু আদালত নির্দেশ দেয় যে, কোনও নির্ভরযোগ্য ও নথিভুক্ত প্রমাণ ছাড়া কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তি পিতা-পুত্র বা পারিবারিক সম্পর্কের আইনি ভিত্তি হতে পারে না।
নথিপত্রে নামের বানান ভুল এবং ঘনঘন ঠিকানার বদলের পিছনেও আমিনুল একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি জানান যে, শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙনের কবলে পড়ার কারণে তাঁদের গ্রাম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই কারণে বাধ্য হয়েই উন্নত আশ্রয়ের খোঁজে তাঁর পরিবারকে বিভিন্ন গ্রামে চলে যেতে হয়েছিল। এর ফলেই বিভিন্ন সময়ের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম আলাদা ঠিকানায় উঠেছে এবং সরকারি কর্মচারীদের কেরানির ভুলের জন্য নামের বানানে এই অসঙ্গতিগুলো তৈরি হয়েছে।
তবে গুয়াহাটি হাইকোর্ট এই যুক্তি মানতে অসম্মতি প্রকাশ করে। আদালত জানায়, নামের বানানের ছোটখাটো ভুলকে সাধারণত বিচারপ্রক্রিয়ায় খুব বড় বাধা হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে নথিভুক্ত ভিন্ন নামধারী বা ভিন্ন বয়সী ব্যক্তিরা যে আসলেই একই ব্যক্তি বা একই পরিবারের সদস্য, তা আমিনুল নথির সাহায্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। নদী ভাঙনের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়ার স্বপক্ষেও কোনো স্বাধীন বা সরকারি রাজস্ব দপ্তরের নথিপত্র প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যায়নি।
ফরেনার্স অ্যাক্টের ধারা ও ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়
ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্টের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও বিতর্ক সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজে থেকেই আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি বিদেশি নন। আমিনুল হকের ক্ষেত্রেও নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের এই আইনি দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের ওপর ন্যস্ত ছিল। গুয়াহাটি হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে বলেছে যে, আবেদনকারী প্রয়োজনীয় নথির সত্যতা প্রমাণের মাধ্যমে এই বিশাল দায়ভার কাটাতে অলঙ্ঘনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ২০১৯ সালের নির্দেশে হস্তক্ষেপের কোনো অবকাশ নেই।
অন্যদিকে, সম্প্রতি ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের একটি বিবৃতিও এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে পরিষ্কার করে বলা হয়েছিল যে, ভারতীয় পাসপোর্টও আদতে একটি অন্যতম ভ্রমণ নথি বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট মাত্র, যা কোনোভাবেই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা শেষ কথা হতে পারে না। অসমে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ যখন ডি-ভোটার বা নাগরিকত্ব নিয়ে টানা পোড়েনের আইনি লড়াই লড়ছেন, তখন নথির সামান্যতম অসঙ্গতিও যে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনা তার একটি জীবন্ত প্রমাণ।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে এই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর এবং গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করবে। আইনি মহলের অভিমত, আসামের চলমান নাগরিকত্ব সংকটে বিচারপ্রক্রিয়া কতটা নিখুঁত প্রমাণ দাবি করে, এই রায় তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আমিনুলের ১৫টি নথি থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নিজের স্থান শক্ত করতে পারলেন না, সেই বিচার বিশ্লেষণ এই রাজ্যে নাগরিকত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে থাকা মানুষের জন্য এক বড় আইনি শিক্ষা হিসেবে থেকে যাবে।












Click it and Unblock the Notifications