অভিষেকের ডানহাত সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা, কোথায় আত্মগোপন আপ্তসহায়কের?
তৃণমূলের যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায় তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে রীতিমতো চাপে। জমি কেনাবেচায় কারচুপি থেকে শুরু করে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দলের প্রার্থী করার নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের মতো নানাবিধ দুর্নীতির তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এই মুহূর্তে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পুলিশের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন সুমিত রায়।
শনিবার সকাল থেকে নিখোঁজ সুমিত রায়ের খোঁজে শালবনি থানার পুলিশ ও জেলা পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন জায়গায় চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। এরই মধ্যে মেদিনীপুর আদালতের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতেই সামগ্রিক রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। গ্রেফতার এড়াতে সোমবারই দ্রুত কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সুমিত রায়ের বিশিষ্ট আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায়।

পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই গুরুতর অপরাধের প্রধান অভিযুক্ত সুমিত রায়ের সন্ধান পেতে গত শনিবার ভোরবেলায় তাঁর বাসভবন ও সম্ভাব্য জায়গাগুলিতে একটি অত্যন্ত নাটকীয় অভিযান চালানো হয়। তদন্তকারী দল আধুনিক মোবাইল ট্র্যাক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জানতে পারে যে, অভিযুক্তের শেষ মোবাইল টাওয়ার লোকেশন দেখাচ্ছিল লোকসভা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার কালীঘাটের বাসভবনে। সেই নির্দিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতেই শালবনি থানার পুলিশ সেখানে হানা দেয়।
কালীঘাটের ওই অত্যন্ত হাইপ্রোফাইল ও সুরক্ষিত বাসভবনে পুলিশ কর্মীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তল্লাশি অভিযান চালালেও সুমিত রায়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সন্ধান পাননি। তল্লাশির পর প্রায় দু’দিন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গোয়েন্দারা এখনো পলাতক সুমিতের মোবাইল সিগন্যাল বা তাঁর বাস্তব কোনো হদিস মেলাতে সমর্থ হননি। তাঁর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি বর্তমানে পুরোপুরি সুইচড অফ বা বন্ধ রয়েছে বলে জেলা পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবারই মেদিনীপুর জেলা মুখ্য আদালত সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার যে আবেদন জানানো হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে মঞ্জুর করে রায় দান করে। নিম্ন আদালতের এই কড়া নির্দেশিকার ফলে পুলিশের পক্ষে এখন পলাতক সুমিতকে যেকোনো স্থান থেকে আইনত গ্রেফতারির আইনি পথ খুলে গেল। চরম বিপাকে পড়ে সুমিতের আইনি দল সশরীরে কলকাতা হাইকোর্টের বিশেষ দ্বারস্থ হয়েও শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা করতে পারেনি।
সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা এই সর্বনাশা অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীদের হাতে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসেরই এক বিতর্কিত প্রাক্তন হেভিওয়েট বিধায়কের নাম। মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা বর্তমানে অন্য একটি ফৌজদারি মামলার জেরে জেলবন্দি রয়েছেন। তিনি সম্প্রতি সংশোধনাগার থেকেই সুমিত রায়ের বিরুদ্ধাচরণ করে তোলাবাজির একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এনে সমগ্র রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছেন।
সুজয় হাজরার বয়ান অনুসারে, আগামী ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে শাসকদল তৃণমূলের পক্ষ থেকে টিকিট পাইয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আপ্তসহায়ক সুমিত রায়। এই লোভনীয় টিকিট দেওয়ার ছলনা দেখিয়ে বিভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছ থেকে দফায় দফায় লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দলের অন্দরমহলের এই গভীর আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে জেলা রাজনীতিতে এখন শোরগোল পড়ে গেছে।
ভোটের টিকিট পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বেআইনিভাবে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা ছাড়াও এই নেতার আপ্তসহায়কের বিরুদ্ধে শালবনি থানা এলাকায় একটি বড়সড় জমি দখল ও বেআইনিভাবে কেনাবেচা সংক্রান্ত আর্থিক দুর্নীতির মামলাও রুজু করা হয়েছে। স্থানীয় শালবনি অঞ্চলের আদিবাসী মহলের জমি দুর্নীতির বিষয়ে সবিস্তারে তদন্ত করতে গিয়েও পুলিশ সুমিতের সরাসরি হাত রয়েছে বলে দাবি করছে। অভিযোগের গভীরতা বিচার করে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তারা কড়া তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
হঠাৎ করেই গ্রেফতারির আশঙ্কা অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠায় সুমিত রায়ের তরফ থেকে তাঁর আইনজীবী সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের একক বেঞ্চে একটি আগাম জামিনের আবেদনপত্র পেশ করেন। সুমিতের আইনজীবীর পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল যাতে উদ্ভূত পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে অন্তত এই সপ্তাহের শুরুতেই মামলাটি অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করে শুনানির ব্যবস্থা করা হোক। বিচারপতি অবশ্য এই আর্জি প্রত্যাখ্যান করেন।
যদিও বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত সুমিত রায়ের সওয়ালকারী আইনজীবীকে মামলাটি হাইকোর্টে নিয়মমাফিক দায়ের করার আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু এর কোনো ধরনের বিশেষ ত্বরান্বিত বা আপৎকালীন শুনানির অনুমতি দেননি। এর স্বাভাবিক অর্থ হলো, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনেই মামলাটি তার নিজস্ব গতিতে শুনানির তালিকায় স্থান পাবে। ফলস্বরূপ, হাইকোর্টের মামলার শুনানির দিন ধার্য হওয়ার আগে পুলিশের হাত থেকে বাঁচার কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আইনি কবচ সুমিতের কাছে থাকছে না।
বঙ্গের রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং শীর্ষ স্তরের এক নেতার নির্ভরযোগ্য আপ্তসহায়কের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের এহেন কঠোর অতিসক্রিয়তা এবং আদালতের স্পষ্ট অসম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের অন্দরের অতি ঘনিষ্ঠ এক বিশ্বস্ত চরিত্রের বিরুদ্ধে খোদ মেদিনীপুর পুলিশের গ্রেফতারির পরোয়ানা আদায় করা সুমিত রায়ের রাজনৈতিক জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে এই মুহূর্তে এক প্রচণ্ড বিপদের মুখে ফেলে দিল।
সব মিলিয়ে, নিম্ন আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে সুমিত রায় এই মুহূর্তে পুলিশের চোখে পলাতক আসামি হিসেবে সম্পূর্ণ আত্মগোপন করে আছেন। কালীঘাটের বাসভবনে তাঁর ফোনের শেষ অবস্থান মেলার পর থেকে তিনি ঠিক কোন গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছেন তা খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শালবনি থানার পুলিশ ও মেদিনীপুর জেলার অপরাধ দমন শাখা। হাইকোর্টের পরবর্তী নির্দেশ আসার আগে এই উত্তেজনাপূর্ণ আইনি লড়াই কোন মোড় নেয়, এখন তাই দেখার বিষয়।












Click it and Unblock the Notifications