পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্ক, ট্রাম্পের সঙ্গে সমীকরণ, কী কী রয়েছে জি৭ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদীর অ্যাজেন্ডায়!
মঙ্গলবার ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বর্তমানে স্লোভাকিয়া সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী এই হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে মূলত 'গ্লোবাল সাউথ' বা দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়নশীল দেশগুলির অধিকার এবং দাবিদাওয়া বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন। একইসঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
ফ্রান্সের এভিয়ান শহরে আগামী ১৬ এবং ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে এই গ্রুপ অফ সেভেন (জি৭) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ এই নিয়ে টানা অষ্টমবার ভারতকে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হল। বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ও প্রভাবেরই এটি একটি বড় প্রমাণ।

ইউরোপ সফরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই আন্তর্জাতিক মঞ্চটিকে তিনি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার কাজে ব্যবহার করবেন। ভারতের বিদেশনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষা করা এবং সেই কথাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
অফিসিয়াল বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লিখেছেন, "জি৭-এ ভারতের উপস্থিতি আমাদের অংশীদারদের আমাদের ওপর রাখা বিশ্বাস এবং আমাদের ক্রমবর্ধমান বৈস্মিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। এটি টানা অষ্টম জি৭ সম্মেলন যেখানে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জি৭ মঞ্চে ভারত কেবল নিজের কথাই বলবে না, বরং এটি গ্লোবাল সাউথের আকাঙ্ক্ষাকেও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবে।"
গত কয়েক বছর ধরে নতুন দিল্লি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জি২০, জাতিসংঘ এবং 'ভয়েস অফ দ্য গ্লোবাল সাউথ' শীর্ষ সম্মেলনের মতো প্রতিপত্তিশালী মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলির উন্নয়ন ঘাটতি এবং মূল উদ্বেগের বিষয়গুলি উপস্থাপন করেছে। এর ফলে ভারত বর্তমান বিশ্বে দক্ষিণ গোলার্ধের একটি প্রধান ও জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
এই কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ বাড়ানোর এবং সেখানে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের। এছাড়া ব্রিকস জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে, যা মূলত পশ্চিমা দেশগুলির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সামনের সারিতে নিয়ে আসতে চায়।
শনিবার হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্মেলনের অবসরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হয়নি, তবে দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার মাঝে এই বৈঠকের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে তীব্র কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একের পর এক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। এই হামলায় বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর জেরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জেসন মিকসকে তলব করে কড়া ভাষায় নিজেদের ক্ষোভ ব্যক্ত করে।
গত শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, "ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর অব্যাহত হামলার বিষয়ে তাঁর কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, যার ফলে ইতিমধ্যেই তিনজন ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন। এই বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা এড়ানো যেত।" এর আগে গত ৯ জুন প্রথমবার মিকসকে তলব করেছিল দিল্লি।
সাম্প্রতিক এই সংঘাত ছাড়াও ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে 'অপারেশন সিঁদুর' এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পঞ্চম যুদ্ধের উপক্রম হওয়ার পর থেকেই কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বরফ জমেছে। এর ওপর রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের সস্তায় জ্বালানি তেল ক্রয় এবং ভারত-মার্কিন শুল্ক বিতর্ক দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
অবশ্য এই সব তিক্ততার মধ্যেও দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি আশার খবর রয়েছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির কাজ বর্তমানে প্রায় নিরানব্বই শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্সির অধীনে এবারের জি৭ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬ বসছে ছবির মতো সুন্দর শহর এভিয়ানে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ভূ-রাজনৈতিক সংকট, ইউক্রেনের চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিরসনই হবে সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয়। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও এখানে আলোচনা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের বিবৃতি অনুসারে, এভিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হবে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। সেই লক্ষ্যে এই সম্মেলনে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তিগুলি একযোগে কাজ করার একটি রোডম্যাপ তৈরি করার বিষয়ে আশাবাদী।
জি৭ গোষ্ঠীর স্থায়ী সদস্য দেশগুলির তালিকায় রয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এবার ভারতের পাশাপাশি আরও কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে চিন, ব্রাজিল, কেনিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিদল।
আন্তর্জাতিক স্তরে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অংশগ্রহণ ভারতের শক্তিশালী বৈস্মিক অবস্থানেরই এক নতুন প্রতিফলন। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক এবং জি৭-এর প্রভাবশালী দেশগুলির সামনে গ্লোবাল সাউথের দাবিদাওয়া তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক নেতৃত্বকে কোন মাত্রায় নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।












Click it and Unblock the Notifications