আমেরিকা ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি! এবার কোনপথে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি?

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মোড় ঘটাতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্স-এ এই বড় কূটনৈতিক সাফল্যের কথা ঘোষণা করেন। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের তীব্র উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত প্রশমনে দুই দেশের এই অভূতপূর্ব সমঝোতাকে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে চলা নিবিড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননসহ সবকটি ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী কূটনৈতিক সাফল্যে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ইতিবাচক ও জোরালো ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেছেন।

President Trump announces historic USA-Iran peace deal

ইরানের গণমাধ্যম তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যেকার এই সুদীর্ঘ ১৪টি ধারার খসড়া সমঝোতা চুক্তির বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপানো দীর্ঘদিনের কঠোর নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে স্থবিরতা অনতিবিলম্বে কেটে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল আবার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে।

এই খসড়া অনুযায়ী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল পরিমাণ মূলধন অবিলম্বে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা হবে। যার মধ্যে অন্তত অর্ধেক পরিমাণ অর্থ চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরানকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে আমেরিকা। এছাড়া ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলির প্রতি ইরানের আর্থিক সমর্থনকে এই খসড়ার বাইরে রাখা হয়েছে।

চুক্তির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হরমুজ প্রণালী ও সমুদ্রপথ সাময়িকভাবে ইরান নিজের দায়িত্বে সচল রাখবে। এই নতুন সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হিসেবে ইরানের প্রতি চাপানো সামুদ্রিক অবরোধগুলি অবিলম্বে ও পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে বলে জানিয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, আগামী শুক্রবারের মধ্যেই এই অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক জলপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।

শান্তি সমঝোতার চুক্তিটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার খবর আসতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব জোরালোভাবে লিখেছেন, "ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সাথে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন!" তবে এর পাশাপাশি জনপ্রিয় দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি সুর কিছুটা কড়া রেখে তেহরানকে স্পষ্ট একটি চরম হুঁশিয়ারি দিতেও মোটেও দ্বিধা করেননি।

ট্রাম্প ওই সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত একটি পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী তেহরানের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ অথবা বড় বিমান হামলা চালানোর কথা ভাববে। অন্যথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান "অভিভাবক" হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেবে, যার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সব দেশ থেকে তাদের মোট অর্জিত রাজস্বের অন্তত ২০ শতাংশ সরাসরি ওয়াশিংটনকে দিতে হবে বলে শর্ত রেখেছেন তিনি।

সমুদ্রপথ আবার ব্যাপকভাবে সচল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প আরও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে শান্তি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে পৃথিবীর সমস্ত দেশের জন্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত থাকবে। বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল পুনরায় অনুমোদন দিয়ে এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক নির্দেশ জারি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র রাজনৈতিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে হওয়া ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিটির সপক্ষে নিজের জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে পরমাণু সংঘাত প্রতিরোধ করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, তিনি এই কূটনৈতিক পথ অবলম্বন না করলে খুব শীঘ্রই ইসরায়েলের চূড়ান্ত পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের মতো এক চরম যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই জটিল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সফল করার ক্ষেত্রে বন্ধুভাবাপন্ন আঞ্চলিক দেশগুলোর অসাধারণ অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন। তিনি আলোচনার সময়ে কাতার সরকারের বলিষ্ঠ মানবিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করার পাশাপাশি সৌদি আরব ও তুরস্কের ভূমিকা ও অবদানকে সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ জানান। সকলের দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুই চরম বৈরী দেশের মধ্যের বড় মতপার্থক্যগুলি মিটিয়ে এই অভূতপূর্ব সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের আগে তার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদারকি করতে আগামী দিনগুলোতে মধ্যস্থতাকারীদের কারিগরি ও পর্যবেক্ষণ কমিটির একাধিক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রকাশিত খসড়া প্রস্তাবটি উভয় দেশের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তেহরান পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রধান পাশ্চাত্য সহযোগীদের অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করতে হবে। এরপর চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ প্রস্তাবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বড় স্বীকৃতি লাভ করবে।

আসন্ন ১৯ জুনের সুইজারল্যান্ডের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক তৈরি করবে। এই ঐতিহাসিক সমঝোতার সুচারু এবং সফল রূপায়ণ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও বাণিজ্যিক প্রগতির এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে বিশ্ব কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন কেবল সুইজারল্যান্ডের সেই বহুল প্রতীক্ষিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর গ্রহণ পর্বের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+