স্নায়ুচাপের ম্যাচে ড্র, মরক্কোর গতির কাছে আটকে গেল ব্রাজিলের জাদুর ছন্দ!
নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনবদ্য এক ফুটবল ম্যাচের সাক্ষী থাকল ক্রীড়াবিশ্ব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল এবং মরক্কো। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ এই লড়াইটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয়। মাঠের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন ছিল রোমাঞ্চকর, তেমনই ছিল দুই দলের শক্তি ও রণকৌশলের সমানে সমানে লড়াই।
বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল অতীতের অনন্য সাফল্যের গৌরবময় ছায়া থেকে বের হয়ে নতুন এক ইতিহাস গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে মরক্কো ফুটবল দল কোনওরকম অতীত ঐতিহ্যের বোঝা মাথায় না নিয়েই এই ম্যাচে মাঠে নেমেছিল। কাতার বিশ্বকাপের অভাবনীয় সাফল্যের পর এই নতুন প্রজন্মের মরোক্কান ফুটবলাররা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়েই লড়াই শুরু করে। ইস্ট রাদারফোর্ডের এই মাঠে ইতিহাস ও নতুন সম্ভাবনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল, যেখানে কেউ কাউকে একচুল জমি ছাড়েনি।
নিউইয়র্কের এই গ্যালারিতে ব্রাজিলের চিরচেনা হলুদ জার্সির সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ব্রাজিলীয় অভিবাসীরা দল বেঁধে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন প্রিয় দলকে সমর্থন জোগাতে। তবে মরক্কোর দুর্দান্ত ফুটবলশৈলী ম্যাচের শুরুতেই সমর্থকদের সেই গর্জনে কিছুটা হলেও বাধা সৃষ্টি করে। ম্যাচের প্রথমার্ধ থেকেই মরক্কো মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আক্রমণ শোধ করতে থাকে।
বিশেষ করে আশরাফ হাকিমি এবং ব্রাহিম দিয়াজের বোঝাপড়া ব্রাজিলের রক্ষণভাগের জন্য বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুই তারকা ডান প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের তটস্থ করে রাখেন। দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে ম্যাচের ২১ মিনিটেই প্রথম গোলের দেখা পেয়ে যায় মরক্কো। এই গোলের মাধ্যমে ম্যাচে নিজেদের আধিপত্যের প্রমাণ দেয় আফ্রিকার এই লড়াকু দলটি।
মরক্কোর এই অনবদ্য গোলের নেপথ্যে ছিলেন ব্রাহিম দিয়াজ। মাঝমাঠ থেকে তাঁর বাড়ানো একটি নির্ভুল পাস ধরে গতিতে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েলকে পরাস্ত করেন ইসমাইল সাইবারি। গ্যাব্রিয়েল পেছনে তাড়া করেও সাইবারিকে থামাতে পারেননি। গোলমুখে এগিয়ে আসা ব্রাজিলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের মাথার ওপর দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় চিপ করে বল জালে জড়িয়ে মরক্কোকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন সাইবারি।
খেলার প্রথম ভাগে পিছিয়ে পড়লেও ব্রাজিল দল মনোবল হারায়নি। ম্যাচের প্রথম অফিশিয়াল হাইড্রেশন ব্রেকের ঠিক পরেই তারা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। দলের সেরা তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়রের পায়ের জাদুতে স্টেডিয়ামের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হলুদ গ্যালারি আবার গর্জে ওঠে। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা উইঙ্গার ব্রাজিলের আক্রমণভাগের আক্রমণের ধার এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দেন এবং প্রতিপক্ষের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন।
বাঁ প্রান্তের টাচলাইনের কাছে সতীর্থ ব্রুনো গিমারায়েসের সাথে চমৎকার এক ওয়ান-টু খেলে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। এরপর ড্রিবলিংয়ের ছন্দে শরীর বাঁকিয়ে নিখুঁত একটি ডান পায়ের বাঁকানো শট নেন তিনি। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে বলটি মরক্কোর জালে জড়িয়ে ১-১ ব্যবধানে সমতা আনে ব্রাজিল। এই দর্শনীয় গোলটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমস্ত ফুটবল অনুরাগীকে মুগ্ধ করে।
এই সমতাসূচক গোলের পর ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি ব্রাজিলের অনুকূলে চলে আসে। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে ব্রাজিল প্রায় এগিয়েই গিয়েছিল। লুকাস পাকেতার নেওয়া একটি অসাধারণ সাইড ভলি নিখুঁত নিশানায় গোলপোস্টের নিচের কোণ দিয়ে জালের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু মরক্কোর বিশ্বস্ত গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় শুন্যে লাফিয়ে উঠে সেই নিশ্চিত গোল থেকে দলকে রক্ষা করতে সমর্থ হন।
দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো তাদের খেলার কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করে। তারা নিজেদের অর্ধের বেশ গভীরে রক্ষণাত্মক দেয়াল গড়ে তোলে এবং প্রতি-আক্রমণ বা কাউন্টার অ্যাট্যাকের ওপর জোর দেয়। এই সুনির্দিষ্ট কৌশলের সুবাদে ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে তারা চমৎকার দুটি গোলের সুযোগও তৈরি করে ফেলেছিল। তবে ব্রাজিলের অতন্দ্র প্রহরী সদৃশ রক্ষণভাগ দুইবারই প্রতিপক্ষের সেই প্রয়াস অত্যন্ত সাফল্যের সাথে প্রতিহত করে।
ম্যাচের শেষ দিকে মরক্কোর ডিফেন্ডার নুসেইর মাজরাউইয়ের একটি মারাত্মক ভুল ব্যাক পাস প্রায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছিল। বলটি প্রায় ব্রাজিলের রাফিনহার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। কিন্তু পোস্ট ছেড়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে লাইনের বাইরে বেরিয়ে এসে গোলরক্ষক বুনো সেই আসন্ন বিপদ থেকে মরক্কোকে উদ্ধার করেন। এর ঠিক পরেই পাল্টা আক্রমণে গিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণকে কাঁপিয়ে দেয় মরক্কো।
মরক্কোর নীল এল আয়নাউই ব্রাজিলের বক্সের ঠিক বাইরে থেকে জোরালো শট নিলেও দলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা প্রতিহত করেন। কিন্তু বিপত্তি কাটে নি। ফিরতি বলে আমাইমাউনি-এশগুইয়াবের নেওয়া রিবাউন্ড শটটিও দুর্দান্ত দক্ষতায় হাত বাড়িয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন এই লিভারপুল তারকা। দুই দলের গোলরক্ষকদের এই অসাধারণ প্রদর্শনীর কারণে ম্যাচের শেষ বাঁশি পর্যন্ত আর কোনো গোল হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ব্রাজিলের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচের রয়েছে এক সোনালী ইতিহাস। ১৯৯৪ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের সেই ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল সেলেসাওরা। অদ্ভুত বিষয় হল, ইতালির সেই রানার্স-আপ দলের সহকারী কোচ ছিলেন ব্রাজিলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলোত্তি। আজকের ম্যাচে আনচেলোত্তির ব্রাজিলকে মরক্কোর আধুনিক ফুটবলের শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পরীক্ষা দিতে হল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই ড্র এবং মূল্যবান একটি পয়েন্ট অর্জন মরক্কোর ফুটবলের বিশ্বমানের যোগ্যতার বড় প্রমাণ। অন্যদিকে, ব্রাজিলের জন্য লড়াইটা হল নিজেদের গৌরবময় অতীতকে স্পর্শ করে এক উন্নত ভবিষ্যৎ খুঁজে নেওয়ার।












Click it and Unblock the Notifications