ভেনেজুয়েলায় ১০০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ ভূমিকম্প, মৃত্যু বেড়ে হতে পারে ১ লক্ষ!
ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল সারা দেশ। দুটি কম্পনেরই তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭-এর বেশি। বিগত একশো বছরের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই জোড়া ধাক্কায় রাজধানী কারাকাস সহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহু বহুতল ভবন ভেঙে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভূকম্পন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটির উৎসস্থল ছিল ক্যারিবীয় উপকূলের মরন শহরের পশ্চিমে, যা রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৭.১ এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে গভীরতা ছিল মাত্র ২২ কিলোমিটার। ঠিক তার এক মিনিট পরেই আছড়ে পড়ে দ্বিতীয় কম্পনটি, যার তীব্রতা ছিল আরও বেশি, প্রায় ৭.৫। দ্বিতীয় ভূকম্পনটির উৎসস্থল ছিল মরন থেকে ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং এর গভীরতা ছিল আরও কম, মাত্র ১০ কিলোমিটার। অগভীর হওয়ার কারণেই ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা এত বেশি।

স্থানীয় প্রশাসন সুনির্দিষ্ট নিহতের সংখ্যা সরকারিভাবে নিশ্চিত না করলেও, মার্কিন সংস্থা ইউএসজিএস ঘটনার ভয়াবহতা বিচার করে এক আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। জনবসতিপূর্ণ এলাকার অনেক বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এই জোড়া কম্পনে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেদেশের বিমান পরিষেবাও।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গভীর দুঃখপ্রকাশ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা জানিয়েছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি সরকারি বিবৃতিতে বলেন, দেশজুড়ে দ্রুত সব ধরনের জরুরি সাহায্য ও উদ্ধারকাজ শুরুর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। রাজধানী কারাকাসের প্রধান বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, যা ত্রাণ পৌঁছানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার কিছু পরে যখন প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়, তখন রাজধানী কারাকাসের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বহুতল ভবনগুলো খড়ের তৈরি খাঁচার মতো দুলছিল। মানুষজন কাজ ফেলে জীবন বাঁচাতে খোলা রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেন। কারাকাসের বেশ কিছু ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় ইটের দেওয়াল সম্পূর্ণ ধসে যাওয়ায় রাস্তা থেকেই ঘরের ভিতরের আসবাবপত্র স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। অনেকেই আতঙ্কে কম্পন থেমে যাওয়ার পরও রাতে ঘরে ফিরতে সাহস পাননি এবং পোষ্যদের নিয়ে রাস্তাতেই রাত কাটিয়েছেন।
এদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এসে দেশবাসীকে শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, দেশের একাধিক রাজ্যে এই তীব্র ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে। কারাকাসের আলতামিরা এলাকাটির পরিস্থিতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক, কারণ সেখানে অনেক বহুতল আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। কাবেলো বিশেষভাবে শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্ধার কাজে নিয়োজিত অ্যাম্বুল্যান্সকে রাস্তায় দ্রুত পথ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
টেলিভিশন ভাষণে কাবেলো আরও বলেন, "আমরা বুঝতে পারছি যে মানুষ অত্যন্ত কঠিন ও মরিয়া পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। তবে আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে কাজ করছি। যাদের সাহায্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই বিপর্যস্ত এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে।" ধসে পড়া বহুতলগুলোর নিচে বহু মানুষ এখনো আটকে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার ফলে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমেছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।
ভেনেজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্প স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রবক্ষেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভূমিকম্পের পরপরই ইউএস প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টারের তরফ থেকে ক্যারিবীয় অববাহিকায় সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। বিশেষ করে ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং ডোমিনিকান আইনল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় উচ্চ জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা থাকায় এই সতর্কতা জারি করা হয়। একই ধরনের সতর্কতা প্রতিবেশী পুয়ের্তো রিকোর জন্যও জারি করা হয়েছিল, তবে পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া ভেনেজুয়েলার জন্য এই জোড়া ভূমিকম্প এক চরম আঘাত। বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা এবং ভেঙে পড়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। এই বিপর্যয় মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা সরকার কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং কোনো আন্তর্জাতিক সাহায্য নেয় কি না, সেদিকেই নজর রাখছে বিশ্বের।












Click it and Unblock the Notifications