মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রসঙ্গ তোলার পরই অ্যাকশন! নদিয়ার তামান্না খুনে পুলিশের জালে আরও ২
নদিয়ার কালীগঞ্জের স্কুলছাত্রী তামান্না খাতুন খুনের মামলায় বড়সড় সাফল্য পেল পুলিশ প্রশাসন। বিধানসভায় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও কড়া নির্দেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশি অ্যাকশনে ধরা পড়ল আরও দুই অভিযুক্ত। মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশের এক বিশেষ তল্লাশি অভিযানে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এই জোড়া গ্রেফতারে তামান্না হত্যাকাণ্ডে মোট ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩ জন।
ধৃত দুই অভিযুক্তের নাম সাবির শেখ ও জিয়ারুল শেখ। পুলিশের একটি বিশেষ দল মঙ্গলবার রাতভর কালীগঞ্জ এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় হানা দিয়ে এই দুজনকে পাকড়াও করেছে। বুধবারই ধৃতদের কৃষ্ণনগর মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে বলে জেলা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে। এই দুই অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছিল।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিধানসভায় তামান্না খুনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে আলোচিত হয়। সেখানে মেয়ের বিচারের দাবিতে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন নিহত ছাত্রীর মা সাবিনা ইয়াসমিন। মেয়ের অকালমৃত্যুর পর থেকে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই অসহায় মা অবশেষে বিধানসভার অলিন্দে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর কথা অত্যন্ত ধৈর্য ধরে শোনেন।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের সময় সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর একমাত্র কন্যাসন্তানের নির্মম মৃত্যুর ঘটনাটি সবিস্তারে তুলে ধরেন। রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের কাছে তিনি কান্নাভেজা চোখে ন্যায়বিচারের জন্য আকুল আবেদন জানান। দীর্ঘ কথোপকথন শেষে মুখ্যমন্ত্রী তামান্নার পরিবারকে দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেন যে, এই নৃশংস কাণ্ডে জড়িত কোনো অপরাধীই রেহাই পাবে না এবং পরিবারটি অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া ও স্পষ্ট বার্তার পরই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন। রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের কড়া নির্দেশে নদিয়া জেলা পুলিশ এবং স্থানীয় থানার অফিসাররা যৌথভাবে গভীর রাতে একটি বড়সড় সার্চ অপারেশন বা চিরুনি তল্লাশি অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানের ফলেই গত এক বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো দুই দাগী অভিযুক্তকে পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশের এই দ্রুত কুড়ি ঘণ্টার পদক্ষেপের পর স্বভাবতই কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে মৃত স্কুলছাত্রীর পরিবার। মেয়েকে হারানোর পর থেকে অনবরত আতঙ্কে থাকা মা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তদারকি করেছেন এবং এত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। প্রশাসনের এই সক্রিয়তা তাঁদের মনে সুবিচার নিশ্চিত করার ব্যাপারে নতুন করে আশার আলো জুগিয়েছে।
তামান্না খুনের ভয়াবহ ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত বছর নদিয়ার কালীগঞ্জ এলাকার রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে। বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের আয়োজন করা একটি বিশাল বিজয় মিছিল ঘিরেই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। সেই বিজয় মিছিলের ভেতর থেকেই আচমকা ব্যাপক বোমাবাজি ও সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, সেই সময়ে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল অবোধ স্কুলছাত্রী তামান্নার। আচমকাই একটি শক্তিশালী বোমা সরাসরি তার গায়ে এসে আঘাত করে। বোমার তীব্র বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়েটি। স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অষ্টম শ্রেণীর এই মেধাবী ছাত্রী। এই মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা এলাকা।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই নদিয়ার কালীগঞ্জে তীব্র গণরোষ দেখা দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দেওয়া হলেও মূল অভিযুক্তদের একাংশ এতদিন আইনের ফাঁক গলে পলাতক ছিল। নিহত ছাত্রীর পরিবারের পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষও এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করে আসছিলেন। মঙ্গলবার পুলিশের জালে সাবির ও জিয়ারুলের ধরা পড়া সেই প্রতিশ্রুতিকেই বাস্তব রূপ দিল।












Click it and Unblock the Notifications