কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ কি ফিরবে? শতবর্ষের ঐতিহ্য বাঁচাতে নবান্নের মাস্টারপ্ল্যান ঘিরে জল্পনা
ঐতিহ্যবাহী এবং শতবর্ষ প্রাচীন ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার জন্য এক বড়সড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকা শেয়ার বাজারটিকে পুনরায় রাজ্যের আর্থিক ও ব্যবসায়িক কাঠামোর মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই এখন রাজ্য প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি এবং নিয়ন্ত্রক জটিলতার জেরে এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এই এক্সচেঞ্জটিকে চিরতরে ইতিহাস হয়ে যেতে দিতে রাজি নয় নতুন সরকার। সেই কারণে শেয়ার বাজারটিকে পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে এর অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো পরিমার্জন করে নতুন কোনো রূপে বাজারে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। এই পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI) এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক অংশীদারদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় বসার পরিকল্পনাও রয়েছে রাজ্য সরকারের।

বর্তমান ভারতীয় শেয়ার বাজারে মুম্বইয়ের বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) তাদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছে। এই প্রবল প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে আবার আগের মতো সাধারণ শেয়ার কেনাবেচার ময়দানে নামানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের দুই প্রথম সারির এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে না গিয়ে সিএসই-র উচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও ক্ষেত্র বা নির্দিষ্ট কোনও বিশেষায়িত ব্যবস্থার দিকে মনোনিবেশ করা।
এই নতুন ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলির (MSME) মূলধন সংগ্রহের একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র পূর্ব ভারতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিপুল উপস্থিতি রয়েছে। এই নতুন উদ্যোগের ফলে সেই সকল মাঝারি মাপের উদ্যোগপতিরা সহজে বাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করার সুযোগ পাবেন। এছাড়া কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং, গ্রিন বন্ড বা পণ্য বাজারের দিকে নজর দিলে এক্সচেঞ্জটি পুনরায় তার উপযোগিতা প্রমাণ করতে পারবে।
শুধু সাধারণ শেয়ার লেনদেন নয়, আধুনিক ফিনটেক প্রযুক্তির ব্যবহারে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বিনিয়োগ গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন নবান্নের শীর্ষ কর্তারা। সরাসরি শেয়ার কেনাবেচা না করেও কীভাবে এই বিশাল পরিকাঠামো ও লাইসেন্সকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি করা যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন কর্পোরেট পরামর্শদাতা সংস্থার সঙ্গেও প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
কলকাতার লায়ন্স রেঞ্জে অবস্থিত সিএসই-র বহুতল ভবনটি একদা ভারতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও এর ইতিহাস উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের অনানুষ্ঠানিক শেয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। স্বাধীনোত্তর ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের পরই কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সফল এক্সচেঞ্জ। দেশের পূর্ব প্রান্তের চা, কয়লা এবং পাট শিল্পের প্রসার ও মূলধন গঠনে এই এক্সচেঞ্জ দশকের পর দশক ধরে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে এসেছিল।
১৯৯৭ সালে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সিএসই-তে কম্পিউটার চালিত ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। তবে ২০০১ সালের কুখ্যাত শেয়ার ব্রোকার কেতন পারেখের আর্থিক কেলেঙ্কারির বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে লায়ন্স রেঞ্জের ওপর। এই বড়সড় আর্থিক অপরাধের পর থেকেই কলকাতার এই শেয়ার বাজারে লিকুইডিটি বা নগদ জোগানের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমতে শুরু করে। অধিকাংশ বড় ব্রোকার ও বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধন সরিয়ে মুম্বইয়ের বড় এক্সচেঞ্জগুলির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন, যা সিএসই-র পতনের পথ প্রশস্ত করে।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ৫ শতাংশ কৌশলগত অংশীদারিত্ব কিনে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাতেও বাজারের পতন রোধ করা সম্ভব হয়নি। পরিশেষে ২০১৩ সালে সেবির কড়া নিয়ন্ত্রক নির্দেশাবলী, বিশেষ করে ন্যূনতম বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ এবং নিট মূল্যের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের স্বাভাবিক ট্রেডিং ক্রিয়াকলাপ স্থগিত করে দেয় দেশের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সেবির তৈরি করা বিশেষ এক্সিট পলিসি অনুযায়ী, দেশের সমস্ত আঞ্চলিক শেয়ার বাজারকে হয় নির্দিষ্ট আধুনিক মানদণ্ড পূরণ করতে হবে, অন্যথায় ব্যবসা গুটিয়ে বাজার থেকে বিদায় নিতে হবে। এই নির্দেশের পরে দেশের প্রায় সব কয়টি আঞ্চলিক শেয়ার বাজার তাদের পাট গুটিয়ে নিলেও কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য তারা আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেয়, যা বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন রয়েছে।
আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সিএসই-র কাছে এখনও রয়ে গিয়েছে বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি এবং নিজস্ব তহবিল। রাজ্য সরকার এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে, যাতে আইন ব্যবস্থার গণ্ডির মধ্যেই একটি টেকসই সমাধান সূত্র খুঁজে নেওয়া যায়। হাইকোর্টের নির্দেশাবলী এবং সেবির শর্তাবলীকে কীভাবে সহাবস্থানে রেখে একটি মধ্যপন্থী পথ বের করা যায়, তা নিয়েই এখন মূলত সরকারি আমলারা আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করছেন।
কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের পুনরুজ্জীবনের এই সরকারি চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিল্প ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাজ্য সরকার ইদানীং কলকাতাকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি ফিনান্সিয়াল এবং ফিনটেক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট। কলকাতার কাছে নিউটাউনে যে আধুনিক আর্থিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, সেখানে সিএসই-কে একটি চালিকাশক্তি হিসেবে স্থাপন করা গেলে তা গোটা পূর্ব ভারতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা পাঠাবে।
ঐতিহ্যবাহী ধারা সংরক্ষণ করে এবং আধুনিক যুগের অর্থনৈতিক চাহিদাকে মেপে নিয়ে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোলা রয়েছে। নিয়মকানুনের বেড়াজাল টপকে পুনর্গঠিত পরিকাঠামো হিসেবে একে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হলে তা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। রাজ্য সরকারের এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে তা শুধু এক সময়ের গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনবে না, বরং রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও বড়সড় ভূমিকা রাখবে।












Click it and Unblock the Notifications