তারাতলায় আর কি বাড়বে মৃতের সংখ্যা? যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলেছে উদ্ধারকাজ
তারাতলা এলাকায় গোডাউন ভেঙে পড়ার ঘটনায় উদ্ধারকাজের সময় যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে একের পর এক নিথর দেহ উদ্ধারের পর এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ জনে। প্রশাসনের আশঙ্কা, ধ্বংসাবশেষের নিচে এখনও বেশ কয়েকজন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের জীবিত অবস্থায় বের করে আনার লক্ষ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রাতভর তল্লাশি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে উদ্ধারকারী দল।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে সশরীরে ছুটে যান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে পৌঁছনোর পর তিনি চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি কর্তাদের একাধিক জরুরি নির্দেশ প্রদান করেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠিক কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, তার সঠিক তথ্য পেতে কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারকে অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর থেকে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং দমকল কর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে এখনও পর্যন্ত মোট ২৫ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হওয়ায় গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া বাকি ২০ জনের মধ্যে ১৮ জনের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল ও তাঁরা সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত। তবে বাকি দুই শ্রমিকের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভেঙে পড়া এই গোডাউনে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের মুঙ্গের জেলার বাসিন্দা। ভিনরাজ্য থেকে কলকাতায় জীবিকার সন্ধানে আসা এই দরিদ্র শ্রমিকদের সঠিক সংখ্যা এবং পরিচয় নিয়ে এখনও একপ্রকার ধোঁয়াশা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, কর্মীর সঠিক হিসেব পেতে এবং কতজন নিখোঁজ আছেন তা জানতে শ্রমিক সরবরাহকারী বা ঠিকাদারকে অবিলম্বে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
তারাতলার এই উদ্ধারকাজ যাতে কোনওভাবেই থমকে না যায়, তার জন্য প্রশাসনিক স্তরে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো উদ্ধারকাজের সার্বিক তদারকি করছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিব। তাঁরা প্রতিনিয়ত ঘটনাস্থল এবং হাসপাতালের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব। পুলিশের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রেখে পুরো সরকারি টিম একটানা কাজ করে চলেছে।
প্রশাসনের দ্রুত ও সমন্বিত তৎপরতার কারণে এই দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতিের পরিমাণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "তৎপরতার কারণেই আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে আমাদের এখন প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হল, যদি এখনও কেউ ধ্বংসস্তূপের ভিতরে জীবিত অবস্থায় আটকে থাকেন, তবে তাঁদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুস্থভাবে উদ্ধার করা।"
এদিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর চাউর হতেই তারাতলার ঘটনাস্থল এবং এসএসকেএম হাসপাতাল চত্বরে আতঙ্কিত পরিবারগুলির ভিড় ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে। প্রিয়জনের কোনো খবর না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অসহায় পরিজনেরা। কেউ খুঁজছেন তাঁর বাবাকে, আবার কেউবা নিজের আদরের ভাই কিংবা পরিবারের একমাত্র রোজগেরে দাদার খোঁজ পেতে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন। এই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আত্মীয়দের সাহায্য করতে এবং সঠিক তথ্য দিতে নবান্নের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের তরফ থেকে তৎপরতার সাথে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত শ্রমিকদের পরিবারের সুবিধার্থে এবং তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে নবান্নের পক্ষ থেকে চারটি জরুরি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই নম্বরগুলিতে ফোন করে নিখোঁজ শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি বা উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সংক্রান্ত যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করা যাবে।
| হেল্পলাইন কেন্দ্র | যোগাযোগের নম্বর |
|---|---|
| নবান্ন কন্ট্রোল রুম (টোল ফ্রি) | ১০৭০ |
| জরুরি মোবাইল নম্বর | ৮৬৯৭৯৮১০৭০ |
| ল্যান্ডলাইন নম্বর ১ | (০৩৩) ২২১৪ ৩৫২৬ |
| ল্যান্ডলাইন নম্বর ২ | (০৩৩) ২২৫৩ ৫১৮৫ |
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, রাতে উদ্ধারকাজ সচল রাখতে অস্থায়ী আলোর লাইটিং ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর জওয়ানরা অত্যাধুনিক গ্যাস কাটার এবং হাইড্রোলিক ক্রেন ব্যবহার করে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্ল্যাব ও ভারী লোহার কাঠামোগুলি সরানোর কাজ চালাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কোনও প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। আহতদের সমস্ত চিকিৎসার দায়ভার রাজ্য সরকার গ্রহণ করেছে।












Click it and Unblock the Notifications