বিয়ের আগেই হবু স্বামীর মর্মান্তিক পরিণতি! লোহাগড় দুর্গের গভীর খাদে কি তবে খুনের ছক?
পুনের লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিং করতে গিয়ে ৪০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ২৫ বছর বয়সী তরুণ ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের। প্রথমে এটিকে স্রেফ একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা বলে মনে করা হলেও, ঘটনার পাঁচ দিন পর উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুনে পুলিশ গভীর তদন্তে নেমে জানতে পেরেছে, এটি কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না, বরং বিয়ের আগেই কেতনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটি ছিল এক ঠান্ডা মাথার খুনের ষড়যন্ত্র।
এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে পুলিশ কেতনের বাগদত্তা তথা হবু স্ত্রী ২০ বছর বয়সী সিয়া গোয়েল এবং তাঁর প্রেমিক ২২ বছর বয়সী চেতন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশি জেরায় দুজনেই এই অপরাধের কথা স্বীকার করেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। মাত্র কয়েক মাস পরেই তাঁদের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, তার আগেই লোহাগড় দুর্গের খাড়া পাহাড় থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয় ওই তরুণকে।

কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়াল পুলিশকে জানিয়েছেন যে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাগদানের পর থেকেই সিয়ার আচরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন কেতন। সিয়া প্রায়ই ফোনে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতেন এবং অন্য এক যুবকের সঙ্গে তাঁর অতিরিক্ত মেলামেশা নিয়ে কেতনের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। কেতন তাঁর পরিবারকে সিয়ার অতীত ইতিহাস এবং চালচলন খতিয়ে দেখার জন্য অনুরোধও করেছিলেন।
পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে সিয়ার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ পরিচয় থাকায় বিশাল আগরওয়াল তাঁর ছেলেকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কেতন প্রায়ই সিয়ার সঙ্গে সামান্য বিষয়ে ঝগড়া হওয়ার কথা জানাতেন এবং চেতন চৌধুরী নামের এক যুবকের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তরুণী সিয়ার বিয়ে একটু পিছিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও সিয়ার পরিবারের পীড়াপীড়িতে চলতি বছরের নভেম্বর মাসেই বিয়ের দিন স্থির হয়।
কেতন আগরওয়াল ছিলেন মহারাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ গুদাম নির্মাণকারী সংস্থা 'সাকসেস গ্রুপ'-এর অন্যতম পরিচালক। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের এফডব্লিউ ওলিন গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ বিজনেস থেকে ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রি নিয়ে ২০২৩ সালে ভারতে ফিরে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। হবু স্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে রাজস্থানের উদয়পুরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের বুকিংও শেষ হয়ে গিয়েছিল。
অন্য দিকে, সিয়া যে যুবকের প্রেমে মগ্ন ছিলেন, সেই চেতনের পরিবারও সিয়ার বাবার ব্যবসার কাছাকাছি এলাকায় নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করত। সিয়া সচ্ছল পরিবারের এই বিয়েতে রাজি হতে পারছিলেন না এবং যে কোনো উপায়ে কেতনের সাথে বিয়ে এড়াতে চাইছিলেন। পুলিশি তদন্তে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সিয়া ও চেতনের সম্পর্কের প্রমাণ মেলে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্তারা সিয়ার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার খোঁজ পান। কেতন একজন দক্ষ ট্র্যাকার হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে লোহাগড় দুর্গের মতো চেনা রাস্তায় পা পিছলে পড়ে গেলেন, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠছিল। এর পরেই তদন্তের জাল ছড়াতেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসতে থাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে কেতন ও সিয়ার একটি প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য বালিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুম্বই বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর হঠাৎই কেতনের passport নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় ট্রিপটি বাতিল করতে হয়। পুলিশ এখন জানতে পেরেছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিয়া নিজেই সেই পাসপোর্টটি লুকিয়ে রেখেছিলেন যাতে তাঁদের বিদেশযাত্রা ভেস্তে যায়।
এখানেই শেষ নয়, কেতনের মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ের সময় তাঁকে একবার পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সিয়া। সে যাত্রায় কেতন নিজেকে সামলে নিলে সিয়া নাটকীয়ভাবে দাবি করেন যে, সেখানে তিনি একটা সাপ দেখতে পেয়েছিলেন এবং কেতনকে বাঁচাতে গিয়েই ওই ধাক্কা লেগেছিল। কিন্তু সেই প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পুনরায় ছক কষা হয়।
১৮ জুন, সিয়ার ২০তম জন্মদিনের ঠিক আগের দিন, কেতনকে আবারও লোহাগড় দুর্গে ঘোরার জন্য রাজি করান সিয়া। পুনে গ্রামীণ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই ষড়যন্ত্রে সক্রিয় অংশ ছিল প্রেমিক চেতন চৌধুরীর। পুলিশের করা কল রেকর্ড অ্যানালিসিস (CDR) থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঘটনার সময় দুর্গ চত্বরে কেতন ও সিয়ার পাশাপাশি চেতন নিজেও উপস্থিত ছিলেন।
নিভৃত স্থানে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে সিয়া ও চেতন দুজনে মিলে অসতর্ক কেতনকে ৪০০ ফুট গভীর গিরিখাতে ঠেলে দেন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় হতভাগ্য কেতনের। এর পর সিয়া এটিকে নিছক একটি দুর্ঘটনাবশত পড়ে যাওয়ার ঘটনা বলে প্রচার করার চেষ্টা করেন এবং পুলিশে প্রাথমিক ডায়েরি করা হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
তদন্তের গতিপ্রকৃতি দেখে পুলিশের সন্দেহ বাড়তে থাকে এবং সিয়াকে কড়া জিজ্ঞাসাবাদের পর পুরো ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। পুনে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, ধৃত সিয়া ও চেতন অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। এই মামলাটিকে পুলিশ মেঘালয়ে ঘটে যাওয়া ইন্দোরের রাজা রঘু বংশীর চাঞ্চল্যকর 'হানিমুন মার্ডার' মামলার সঙ্গে তুলনা করছে, যা গত বছর দেশ জুড়ে শোরগোল ফেলেছিল।
ধৃত সিয়া গোয়েল ও চেতন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ধারা ১০৩ (খুন) এবং ধারা ৬১(২) (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র)-এর অধীনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পারিবারিক পছন্দ ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে এক তরুণ শিল্পপতিকে চরম পরিণতি বরণ করতে হলো, তা নিয়ে তোলপাড় পুনের ব্যবসায়ী মহল। আদালত দুপক্ষকেই আপাতত নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications