ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ২৩৫, এখনও নিখোঁজ বহু
ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপেছে ভেনেজুয়েলা। লাতিন আমেরিকার এই দেশটির উত্তরাঞ্চলে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে আঘাত হেনেছে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। সরকারি সূত্রের খবর, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৪,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে ১৭০ কিলোমিটার দূরে মরোন শহরের কাছে। এর মাত্র এক মিনিট পরেই আঘাত হানে ৭.৫ তীব্রতার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি। গবেষকদের মতে, ভূপৃষ্ঠের অগভীর অংশে এই জোড়া কম্পন সৃষ্টির ফলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ব্রাজিলের ভূত্বক গবেষণা সংস্থার ভূপদার্থবিদ মার্কোস ফেরেরা এই জোড়া কম্পনের ধ্বংসলীলা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, অগভীর ভূকম্পনের সঙ্গে একের পর এক তীব্র কম্পন যোগ হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি বিষয়টিকে তুলনা করেছেন একের পর এক চিৎকারের শব্দের সাথে, যা কম্পনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে সম্ভাব্য বিপদকে আরও মারাত্মক করে তোলে।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল। এই লা গুয়াইরার জন্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় নতুন কিছু নয়, ১৯৯৯ সালের এক বিধ্বংসী কর্দমাক্ত ধসে এখানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমানে এই অঞ্চলের মূল বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ থাকায় বিমানযোগে দ্রুত আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছানোর কাজে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
লা গুয়াইরা জুড়ে এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের সন্ধান চলছে। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক হুয়ান আলবার্তো মেনদানো ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় এক নারীকে হাত নাড়িয়ে সাহায্য চাইতে দেখেন। অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ান কারেনো নামের এক বাসিন্দা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তার সর্বস্ব এই ভূমিকম্পে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং অনেক প্রতিবেশী এখনও বহুতলের ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই আটকা পড়ে আছেন।
রাজধানী কারাকাসের পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক। শহরের বিস্তূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পাতাল রেল পরিষেবাও স্থগিত রয়েছে। আগামী কয়েকদিন সমস্ত স্কুল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু স্কুল ভবনকে আশ্রয় শিবির ও ত্রাণ সংগ্রহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পতনের আশঙ্কায় ফাটল ধরা বহুতল ছেড়ে কারাকাসের শত শত মানুষ ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেই পার্ক ও খোলা পার্কিং লটে রাত কাটিয়েছেন। আতঙ্কের প্রহর কেটে যাওয়ার পর ভোরের আলো ফুটতেই নিখোঁজ স্বজনদের ছবি ও হাতে লেখা নামের তালিকা নিয়ে পথে নেমেছেন সাধারণ মানুষ। ওদিকে বিদেশে অবস্থানরত ভেনেজুয়েলার অভিবাসীরাও ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে চরম উদ্বেগের দিন কাটাচ্ছেন।
উদ্ধারকাজে গতি আনতে এবং নিখোঁজদের অবস্থান নির্ণয়ে সরকারের ওপর এক প্রকার চাপ সৃষ্টি করে জাতিসংঘ। তাদের বিশেষ অনুরোধের পর ভেনেজুয়েলার জনগণের তথ্য আদানপ্রদানের পথ সহজ করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর তথ্য সরবরাহ রুখতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এই ওয়েবসাইটটি ব্লক করেছিলেন।
এই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভেনেজুয়েলা প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র অর্থনৈতিক ও মুদ্রাস্ফীতির সংকটে ভুগছে। গত জানুয়ারি মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানে ধৃত হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন শাসক হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তৎকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে দেশের ভেতরে করছি তুমুল বিতর্কের মাঝেই এই বিপর্যয় রদ্রিগেজ প্রশাসনের সামনে পর্বতসমান চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলোর দ্রুত আগমন আশা করছেন। দুর্গত হাসপাতাল ও গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসন সর্বমোট ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি তহবিল গঠনের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করার আবেদনও জানিয়েছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলার এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে সাড়া দিয়ে মার্কিন অর্থ দপ্তর এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আগামী ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত এই শিথিলতা কার্যকর থাকবে, যার ফলে ত্রাণ সংক্রান্ত অর্থনৈতিক লেনদেনে আর কোনো আইনি বাধা থাকবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, আমেরিকা দ্রুত এবং বড় আকারে উদ্ধারকারী সরঞ্জাম ভেনেজুয়েলায় পাঠাচ্ছে।
শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, মেক্সিকো, কাতার, ব্রাজিল, স্পেন, পর্তুগাল এবং কানাডার মতো বেশ কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ সামগ্রীর পাশাপাশি ড্রোনের মতো আধুনিক তল্লাশি প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর স্কোয়াড এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে একের পর এক উদ্ধারকারী উড়োজাহাজ আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ডমিনিকান রিপাবলিকের একটি সাহায্যকারী দল বিপর্যস্ত এলাকায় কাজ শুরু করেছে।
ভেনেজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্প এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তার ঝাঁকুনি প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিলের বিশাল আমাজন অঞ্চলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বড় বড় ভবন খালি করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভেনেজুয়েলা সংলগ্ন ভূস্তরে মাঝেমধ্যে প্রবল চাপ তৈরি হয়, যার ফলে এই অনভিপ্রেত বিপর্যয় ঘটল।
ভূমিকম্পের তীব্র ধাক্কা সামলে রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু একটি দেশের পক্ষে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না। আন্তর্জাতিক সহায়তার সঠিক প্রয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ উদ্ধার তৎপরতা কত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের কাছে পৌঁছায়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অগ্রগতি। এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লাতিন আমেরিকার এই ঐতিহ্যবাহী দেশ কীভাবে নিজেকে পুনরায় সংগঠিত করবে, তা এখন কোটি কোটি মানুষের মূল চিন্তার বিষয়।












Click it and Unblock the Notifications