বাণিজ্যিক এলপিজি-র সংকট কাটল! মোদী সরকারের ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের জন্য বিরাট স্বস্তি
দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে এক বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এল নরেন্দ্র মোদী সরকার। উৎসবের মরসুমের প্রাক্কালে পেট্রোলিয়াম পণ্যের জোগান স্বাভাবিক করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করল দিল্লি। বাণিজ্যিক ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত নন-ডোমেস্টিক প্যাকড এলপিজি (LPG) বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ পূর্বের স্বাভাবিক স্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাহার করা হয়েছে সমস্ত ধরনের ক্ষেত্রভিত্তিক বিধিনিষেধও।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের এক উচ্চপর্যায়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং মার্কিন-ইজরায়েল সংঘাতের জেরে কয়েক মাস আগে আচমকাই এলপিজি আমদানিতে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্থিমিত রয়েছে। বিশ্ববাজারে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন এবং এলপিজি জোগানের ক্রমাগত উন্নতি ঘটায় এই কড়া বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকারি এই বড় সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অসংখ্য হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসন এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থাগুলি আবার আগের মতো প্রয়োজনীয় গ্যাস পেতে শুরু করবে। পাশাপাশি, বাল্ক এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকেরা এখন সংকটের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাল্ক এলপিজি সংগ্রহ করতে পারবেন। কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তন শিল্পক্ষেত্রের উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনরায় মসৃণ করতে প্রভূত গতি জোগাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে গোলযোগ বাঁধলে ইরানে আক্রমণ করে আমেরিকা ও ইজরায়েল। এরপরই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালী হল বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলপিজি সরবরাহের অন্যতম প্রধান জলপথ। ফলে ভারতের মতো বৃহৎ আমদানিকারী দেশে সমুদ্রপথে এলপিজি আমদানির ওপর ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল এবং সরকার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছিল।
ভারতে আমদানিমুখী গ্যাসের জোগানের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের প্রতিদিনের রান্নার দুর্ভোগ এড়াতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে কেন্দ্র। মোদী সরকার অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আইনের আওতায় এই সরবরাহ ব্যবস্থা নিজেদের হাতে নেয়। রান্নার গ্যাস নিশ্চিত করতে আমদানিকৃত গ্যাসের একটি সিংহভাগ কেবল ডোমেস্টিক সিলিন্ডার তৈরির কাজে ব্যবহার করা শুরু হয় এবং বাণিজ্যিক ও শিল্পে গ্যাসের জোগানের পরিমাপ সংকুচিত করা হয়।
ঘরোয়া সিলিন্ডারের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখতে সে সময় সরকার সিথ্রি (C3) এবং সিফোর (C4) নামক দুটি মূল হাইড্রোকার্বন স্ট্রিম শুধুমাত্র এলপিজি প্রস্তুতকারী রিফাইনারিগুলোর জন্য সংরক্ষণ করেছিল। পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য শিল্পে এর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। বর্তমানে এলপিজির জোগান আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসায়, রিফাইনারিগুলো পুনরায় এই গ্যাস দুটি অন্যান্য শিল্পে ব্যবহারের জন্য ছাড়তে পারবে। তবে তা ঘরোয়া সিলিন্ডারের মোট জোগান বজায় রেখেই করতে হবে।
শিল্পে এই মূল উপাদান বণ্টন ব্যবস্থার ওপর কড়া নজরদারি চালাবে সরকারের একটি বিশেষ টেকনিক্যাল বডি বা কারিগরি কমিটি। কোন কারখানা কী পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছে, তা নিয়মিত মন্ত্রককে রিপোর্ট পাঠানো হবে। এর পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ ধরনের জ্বালানি বিপর্যয় সামাল দিতে দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক এবং শিল্পক্ষেত্রের এলপিজি ব্যবহারকারীদের নিয়ে একটি সুসংহত কেন্দ্রীয় ডাটাবেস বা অভিন্ন তথ্যভাণ্ডার তৈরি করবে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও বেশি নিপুণ হবে।
বিশ্ববাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরেও গ্যাসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গিয়ে সাধারণের পকেটে টান ফেলেছিল। গত মার্চ মাসে ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের দাম সিলিন্ডার প্রতি এক ধাক্কায় ৬০ টাকা বৃদ্ধি পায়। এরপর জুন মাসে ফের ২৯ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী দিল্লিতে ১৪.২ কেজি গার্হস্থ্য সিলিন্ডারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯৪২ টাকায়। তবে গৃহস্থালির চেয়েও বেশি চাপে পড়েছিলেন দেশের বাণিজ্যিক এলপিজি ব্যবহারকারীরা।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ১৯ কেজির বড় এলপিজি সিলিন্ডারের বারংবার মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। শুধুমাত্র মে মাসেই এর দাম রেকর্ড ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। বর্তমানে দিল্লিতে প্রতিটি বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩,১১৩ টাকা। হোটেল, ফুড আউটলেট বা বিভিন্ন ছোট কারখানাগুলির খরচ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেউলিয়া হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় এবার সেই অতিরিক্ত খরচের বোঝাও কিছুটা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
| সিলিন্ডারের ধরন | ওজন (কেজি) | দিল্লিতে বর্তমান মূল্য (টাকা) |
|---|---|---|
| গার্হস্থ্য বা গৃহস্থালি গ্যাস সিলিন্ডার | ১৪.২ কেজি | ৯৪২ টাকা |
| বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার | ১৯ কেজি | ৩,১১৩ টাকা |
বর্তমান এলপিজি পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধাপে ধাপে পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস বা পিএনজি (PNG) ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে চায় কেন্দ্র। পিএনজি অনেকটাই নিরাপদ, দূষণমুক্ত ও সাশ্রয়ী অপশন হিসেবে স্বীকৃত। যেসব এলাকায় ইতিমধ্যেই পিএনজি জোগান দেওয়ার মতো পাইপলাইন পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের দ্রুত এলপিজি থেকে পিএনজি-তে রূপান্তরের জন্য অনুরোধ করেছে মন্ত্রক। গ্যাস বিপণনকারী সংস্থাগুলিও এতে বিশেষ সুবিধা প্রদান করবে।
এই সরবরাহ পুনর্বিন্যাস ও নতুন নিয়মকানুন যাতে মাঠ স্তরে অত্যন্ত মসৃণভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার জন্য সব ক’টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে বিশেষ সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের জ্বালানি সুরক্ষা যেমন জোরদার হবে, তেমনই পরিবেশবান্ধব বিকল্পের ব্যবহারও দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় থাকার মাধ্যমে আসন্ন দিনগুলিতে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী প্রভাব পড়বে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।












Click it and Unblock the Notifications