অযোধ্যা রাম মন্দিরে দান ও প্রণামীর টাকা তছরুপ! বড়সড় জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার ৮, নেপথ্যে কি আরও বড় চক্র?
অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া দান ও প্রণামীর বিপুল অর্থ তছরুপের মামলায় কড়া পদক্ষেপ করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। রাজ্য সরকারের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের (SIT) প্রাথমিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রথম এফআইআর দায়ের করা হয়। আর তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মূল অভিযুক্ত ৮ জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের শীর্ষ সূত্রের খবর অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া এই ৮ অভিযুক্তকেই হেফাজতে নিয়ে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে অযোধ্যা পুলিশ। ধৃতদের গ্রেফতারি মেমো প্রস্তুত করা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়াগুলি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের অন্যতম বিশ্বস্ত সদস্য শ্রী কৃষ্ণ মোহনের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই জেলা পুলিশ এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

অযোধ্যা কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা এই মামলায় অভিযুক্তদের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মণীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিনু। এফআইআরে এই আটজন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির নামও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর ধারা প্রয়োগ করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের কড়া ধারায় মামলা দায়ের হওয়ায় এই চক্রটিকে সমূলে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মন্দিরের অভ্যন্তরীণ তহবিল পরিচালনায় যুক্ত থাকা স্বত্বেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও চুরিতে মদত দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে ধৃতদের বিরুদ্ধে।
শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্রের মতো স্পর্শকাতর এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানে এ ধরণের জালিয়াতির ঘটনা হিন্দু সমাজের ভাবাবেগকে নাড়া দিয়েছে। ভক্তদের আবেগের অমর্যাদা রুখতে এবং এই চুরির নেপথ্যে কোনো বড় চক্র রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতেই পুলিশ প্রশাসন তড়িৎগতিতে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
মন্দিরে সততা বজায় রাখার স্বার্থে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ট্রাস্টের সদস্য কামেশ্বর চৌপালের আকস্মিক মৃত্যুর পর, তাঁর শূন্যস্থান পূরণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সর্বসম্মতিক্রমে কৃষ্ণ মোহনকে নতুন ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সমাজকর্মী হিসেবে সুপরিচিত এবং ভারতীয় বন পরিষেবা (IFS) থেকে অবসরপ্রাপ্ত এই আধিকারিকই এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরদার সওয়াল করেন।
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী কৃষ্ণ মোহন অতীতে পরমাণু শক্তি ক্ষেত্র এবং পরে ভারতীয় বন পরিষেবায় দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণেই ট্রাস্টে তাঁকে বিপুল সমর্থন জানানো হয়েছিল। মন্দিরের তহবিলে বিশৃঙ্খলা রুখতে তিনিই পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পুলিশের দ্বারস্থ হন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, রাম মন্দিরের দান সামগ্রী নিয়ে নয়ছয়ের খবর পাওয়ার পরে উত্তরপ্রদেশ সরকার গত ১৩ জুন একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে। ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ আলোচনার পরই সরকারের কাছে তদন্তের অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল। সিটের দেওয়া তদন্ত সূত্রের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানে পুলিশি ধরপাকড়ের সাফল্য এসেছে।
এদিকে এই গ্রেফতারির ঘটনা জানাজানি হতেই উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় ব্যাপক উত্তেজনার পারদ চড়েছে। বর্তমান রাজ্য সরকারের তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক তীক্ষ্ণ বার্তায় তিনি দাবি করেন, সরকার কেবল ছোট অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে আসল রাঘববোয়ালদের আড়াল করছে।
অখিলেশ যাদব তাঁর পোস্টে অভিযোগ করে বলেন, এফআইআর দায়ের করার ঠিক আগের মুহূর্তে বড় অপরাধীদের আড়াল করতেই এই সিট মামলার তদন্ত সাজানো হয়েছে। তাঁর ইঙ্গিত, মূলত প্রমাণ লোপাট এবং সুবিধাজনক উপায়ে তদন্তের মোড় ঘোরানোর জন্যই আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। সমাজবাদী পার্টির এই প্রতিক্রিয়া গোটা রাজ্যে তোলপাড় বাড়িয়ে দিয়েছে।
সপার এই জোরালো আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে বিলম্ব করেনি গেরুয়া শিবির ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)। পরিষদের কার্যনির্বাহী সভাপতি আলোক কুমার পাল্টা দাবি করেছেন যে, বিরোধীরা কেবলই সংকীর্ণ রাজনীতির স্বার্থে এই বিষয় নিয়ে মাঠে নামছে। ২০২৭ সালের আসন্ন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন মাথায় রেখেই সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস অযথা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে রাম মন্দির আন্দোলনের সময় সমাজবাদী পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিল, তাদের তৎকালীন বিতর্কিত ভূমিকার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্দির আন্দোলনকে দমন করার প্রয়াস যারা করেছিল, আজ তারাই দানের টাকা নিয়ে উদ্বেগ দেখাচ্ছে বলে কটাক্ষ করা হয়। তবে সাধারণ মানুষ ট্রাস্টের পদক্ষেপের ওপর বিশ্বাস রাখছেন বলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মনে করে।
চলতি বছরের জুন মাসের শুরুর দিকে যখন রাম মন্দিরের বিপুল পরিমাণ দানের অর্থ আচমকাই নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়ায়, তখন থেকেই বিরোধীরা সোচ্চার হয়েছিল। এমনকি আদালতকে এই দুর্নীতি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যেও আবেদন করেছিল সমাজবাদী পার্টি। কিন্তু রাজ্য সরকার যেভাবে সিট গঠন করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তদন্তের কার্যকারিতা জোরদার হয়েছে।
রাম মন্দিরের ভাবাবেগ ও আস্থার জায়গা অপবিত্র করার ধৃষ্টতা যারাই দেখাক, তাদের কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে মন্দিরের ভক্তরা মনে করছেন। এখন পুলিশের জেরা কতখানি সফল হয় এবং এই গ্রেফতারির পর উদ্ধার হওয়া অঙ্কের পরিমাণ কত দাঁড়ায়, সেদিকেই নজর থাকবে গোটা দেশের রামভক্তদের।












Click it and Unblock the Notifications