পাসপোর্ট থাকলেই ভারতীয় নাগরিক নয়! নাগরিকত্ব প্রমাণে তাহলে কী প্রয়োজন?

বিদেশ ভ্রমণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের পরিচয় বহনকারী গুরুত্বপূর্ণ নথি হল পাসপোর্ট। দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে পাড়ি দিতে গেলে এই একটি নথির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য নতুন করে একটি পুরনো এবং জটিল আইনি বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাসপোর্ট ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

এই ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে। যে নথির জন্য দীর্ঘ পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং একাধিক সরকারি রেকর্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, সেটিও যদি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ না হয়, তবে আসল প্রমাণ কী? ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলির আবহে এই প্রশ্ন এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

Indian passport and Aadhaar card documents on table

ধাঁধা তৈরি হয়েছে ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের কারণে। এই আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই কেবল পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব। আবার ৬(২)(এ) ধারা নির্দিষ্টভাবে বলে, আবেদনকারী ভারতের নাগরিক না হলে তাঁকে পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ, রাষ্ট্র সন্তুষ্ট হওয়ার পরই পাসপোর্ট ইস্যু করে। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রকের মতে, পাসপোর্ট নাগরিকত্বের 'জোরাল প্রমাণ' হলেও তা 'চূড়ান্ত প্রমাণ' নয়।

আইনগতভাবে সরকারের কাছে ক্ষমতা থাকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া বা জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত পাসপোর্ট বাতিল করার। মূলত এই প্রযুক্তিগত সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণেই মন্ত্রক পাসপোর্টকে চূড়ান্ত প্রমাণ বলতে নারাজ। তবে এই যুক্তি সাধারণ নাগরিকের জন্য অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। সার্বভৌম রাষ্ট্র দ্বারা জারি করা সবচেয়ে সুরক্ষিত সরকারি নথিও যদি নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তবে বিকল্প পথ কী থাকে?

একই রকম বিভ্রান্তি রয়েছে ভোটার পরিচয়পত্র বা ভোটার কার্ড নিয়েও। সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধনের মামলায় সুপ্রিম কোর্টেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। ভোটার কার্ড একজন ব্যক্তির ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত থাকার প্রমাণ দেয়, কিন্তু এটি এককভাবে সেই ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী কেবল নাগরিকরাই ভোট দিতে পারেন, তবে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ যেকোনও সময় নাগরিকত্বের বৈধতা খতিয়ে দেখতে পারে।

ভারতের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা প্যান কার্ড থাকলেই বোধহয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয়। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, আধার কার্ড শুধুমাত্র ভারতে বসবাসের প্রমাণ। আধার আইনের বিধানগুলিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে এটি কোনওভাবেই নাগরিকত্বের শংসাপত্র বা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

একইভাবে, আয়কর বিভাগের দেওয়া প্যান কার্ড শুধুমাত্র করদাতা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করে। রেশন কার্ড মূলত সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার। আবার জন্ম শংসাপত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট ভারতে জন্মগ্রহণের প্রমাণ দিলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে না। কারণ ভারতীয় নাগরিকত্ব শুধু জন্মস্থানের ওপর নয়, পিতামাতার নাগরিকত্ব এবং বংশানুক্রমিক ইতিহাসের ওপরেও নির্ভর করে।

এই জটিলতার কথা কেন্দ্রীয় সরকারও স্বীকার করেছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে প্রশ্ন করা হয়েছিল— আধার, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি, প্যান কার্ড বা জন্ম শংসাপত্রকে নাগরিকত্বের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিষ্কার জানিয়েছিল, এর কোনওটিই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং অর্জন সম্পূর্ণভাবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভারতের সংবিধানে এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্ব অর্জনের পাঁচটি উপায়ের কথা বলা হয়েছে— জন্মসূত্রে, বংশানুক্রমিকভাবে, নিবন্ধীকরণের মাধ্যমে, স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে এবং কোনো ভূখণ্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সূত্রে। তাই কার নাগরিকত্ব কীভাবে প্রমাণিত হবে, তা নির্ভর করে তিনি কোন নিয়মে নাগরিকত্ব দাবি করছেন তার ওপর। কিছু মানুষের জন্য বংশানুক্রমিক নথির প্রয়োজন হয়, আবার কিছু মানুষের জন্য নিবন্ধীকরণ শংসাপত্র জরুরি।

আদালতগুলিও নাগরিকত্বের প্রশ্নে একক কোনো নথির ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক নথির ওপর জোর দেয়। একমাত্র 'সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট' বা নাগরিকত্ব শংসাপত্রকেই সরাসরি নাগরিকত্বের অকাট্য আইনি দলিল ধরা হয়। কিন্তু এই শংসাপত্র শুধুমাত্র তাঁদেরই দেওয়া হয় যাঁরা নিবন্ধীকরণ বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ভারতের নাগরিক হয়েছেন। জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক হওয়া দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে এই নির্দিষ্ট শংসাপত্রটি থাকে না।

ঐতিহাসিকভাবে ভারতের আইনি ব্যবস্থা এমনভাবে চলে আসছে যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে এদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই জন্মসূত্রে নাগরিক, যতক্ষণ না কোনও নির্দিষ্ট বিতর্ক বা সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। পূর্বে এই ব্যবস্থার কারণে কোনও সমস্যা হয়নি, কারণ সাধারণ মানুষকে কখনও নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হতো না। কিন্তু বর্তমান যুগে নাগরিকত্ব যাচাই বা ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রক্রিয়াগুলি এই ব্যবস্থার খামতিগুলোকে প্রকট করে তুলছে।

সব মিলিয়ে এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে একজন মানুষের কাছে আধার, ভোটার কার্ড, প্যান এবং পাসপোর্ট থাকার পরেও তাত্ত্বিকভাবে তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্ভব। বিদেশ মন্ত্রকের এই ব্যাখ্যা হয়তো আইনি দিক থেকে সঠিক, কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকত্বের মতো মৌলিক অধিকার প্রমাণের জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং সর্বজনীন নথি থাকা অত্যন্ত জরুরি।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+