শান্তি নাকি নতুন সংঘাত? আমেরিকা-ইরান ঐতিহাসিক চুক্তির আড়ালে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের চরম উত্তেজনা নিরসনে অবশেষে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের অবসরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, তেহরানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারকটি (MoU) বিশ্ব কূটনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। তবে এই শান্তি সমঝোতার আবহেই ইরানকে কড়া ভাষায় সামরিক হুঁশিয়ারি দিতেও ছাড়েননি তিনি।

জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের অবসরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে এই সম্ভাব্য ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সামনে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, এটি সাধারণ কোনো সংক্ষিপ্ত খসড়া নয়। এই সমঝোতা স্মারকটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং খুঁটিনাটি প্রতিটা বিষয়ে সমন্বিত যা একটি নিয়মিত চুক্তিপত্রের মতোই অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট আইনি রূপরেখা নিয়ে তৈরি হয়েছে।

Donald Trump announcing historic US-Iran peace deal at G7

প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেছেন যে শেষ পর্যন্ত ইরান এই চুক্তির প্রতিটি শর্ত সুচারুভাবে মেনে চলবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতারা এখন নিজের দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনও মূল্যে একটি টেকসই ও অর্থপূর্ণ সমঝোতায় আসতে পুরোপুরি প্রস্তুত। যদি কোনো কারণে তেহরান চুক্তি থেকে সরে যায়, তবে ওয়াশিংটনকে আবার প্রথম থেকে কূটনৈতিক দর কষাকষির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের কথা বললেও ট্রাম্প মার্কিন কঠোর মনোভাব বজায় রাখতে ভোলেননি। একই দিন মিশরের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, এই চুক্তি মোটেও চূড়ান্ত কোনো সমাধান নয়। তেহরান যদি চুক্তির শর্তাবলী লঙ্ঘন করে বা ভালো আচরণ না করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কঠোর সামরিক পদক্ষেপ অর্থাৎ পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সোজাসুজি বলেন, যদি আমার চুক্তিটি পছন্দ না হয় অথবা ইরান যদি কোনো অনিয়ম করে, তবে আমরা সরাসরি তাদের ওপর হামলা চালাব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের ৪৭ বছরের নেতিবাচক আচরণের ইতিহাস তুলে ধরে হুঁশিয়ার করে বলেন, শর্তানুযায়ী শান্ত হয়ে না চললে তাদের মূল ভূখণ্ডে আবার মার্কিন বোমাবর্ষণ শুরু হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময়ে আগের মতো যুদ্ধংদেহী অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।

এই সমঝোতা চুক্তির রূপরেখা প্রস্তুত হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে চলা প্রকাশ্য বৈরিতার অবসানে এই চুক্তিকে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেই সুইজারল্যান্ডের এই স্বাক্ষরের মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।

চুক্তির প্রস্তাব অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি ৬০ দিনের বিশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মেয়াদের মধ্যে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সীমিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা চূড়ান্ত করতে হবে। এর বিপরীতে মার্কিন প্রশাসন তেহরানের ওপর থেকে সিংহভাগ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে, যা দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই ব্যাপক কূটনৈতিক খসড়া প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও শান্তি পুনরুদ্ধারের একটি বড় পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইজরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত স্থায়ী বন্ধ করার উদ্দেশ্যে একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তও এই সমঝোতায় রাখা হয়েছে। এই সমাধান সূত্রটি মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিধ্বংসী ছায়াযুদ্ধ ও চরম মানবিক সংকটের তীব্রতা অনেকটাই হ্রাস পাবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নয়া দিল্লির অপরিশোধিত তেল আমদানি সচল রাখার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাছাড়া ইরানের চাবাহার বন্দরের সম্প্রসারণ এবং মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বারে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। এই সংবেদনশীল সময়ে আমেরিকা-ইরান শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে দিল্লির গভীর আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে মূলত প্রথাগত 'গাজর ও লাঠি' নীতি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বজায় রাখছেন। একদিকে তিনি ইরানের ভগ্ন অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য বিধিনিষেধ শিথিল ও অবাধ বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করার সুবিধা দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিন্দুমাত্র নিয়ম লঙ্ঘন হলে পুনর্নবীকরণযোগ্য সামরিক হামলার সরাসরি হুমকি দিয়ে চলেছেন। এই দ্বিবিধ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত আমেরিকার সামরিক কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইছেন।

বিশ্ব কূটনৈতিক মহলের নজর এখন আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিকে। ট্রাম্পের এই নরম-গরম নীতি ইরানের সরকারকে শেষ পর্যন্ত স্থায়ী চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন। সাড়ে চার দশকের বেশি সময়ের তীব্র বৈরিতা কাটিয়ে আমেরিকা ও ইরান কি এক নতুন কূটনৈতিক সহাবস্থানের যুগে পা রাখতে পারবে, নাকি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সত্যি হয়ে যুদ্ধ শুরু হবে, তা জানা যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+